চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা একটি ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বড় ধরনের সফলতা পেয়েছেন। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে মনাকষা ইউনিয়নের মাস্তানমোড় এলাকায় ৫৩ বিজিবির একটি বিশেষ টহল দল এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে ১০টি দামী মোবাইল ফোন এবং একটি মোটরসাইকেলসহ দুই যুবককে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। আটককৃতরা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ পথে ভারতীয় মালামাল আনা-নেওয়া করছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন যে ভারত থেকে অবৈধভাবে কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য বাংলাদেশে ঢোকানো হচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্রই মনাকষা বিওপির সদস্যরা মাস্তানমোড় এলাকায় ওত পেতে থাকেন। যখন একটি মোটরসাইকেল ওই এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন বিজিবি সদস্যরা সেটিকে থামার সংকেত দেয়। মোটরবাইকে থাকা দুই আরোহী পালানোর চেষ্টা করলে টহল দল তাদের ধাওয়া করে ধরে ফেলে। পরে তাদের শরীর তল্লাশি করে কোমরে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ৮টি ভারতীয় মোবাইল সেট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তাদের সাথে থাকা আরও ২টি ব্যক্তিগত মোবাইল ও ১টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।
বিজিবির হিসাব অনুযায়ী, জব্দ করা এই মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৯ টাকা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ($) দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের চোরাচালানি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। চোরাকারবারিরা সাধারণত সরকারকে কোনো প্রকার রাজস্ব বা ট্যাক্স না দিয়ে অবৈধ পথে পণ্য এনে বাজারে বিক্রি করে থাকে। এতে তারা প্রায় ৫০% থেকে ১০০% পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে। এই ধরনের অবৈধ ব্যবসার কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং দেশ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
আটককৃত দুই ব্যক্তি হলেন শিবগঞ্জ উপজেলার পারচৌকা গ্রামের মো. আবুল কালামের ছেলে মো. শাহিন আলম (২০) এবং একই গ্রামের মো. বেলাল উদ্দিনের ছেলে মো. মাহফুজ (১৭)। বিজিবি জানিয়েছে, এদের মধ্যে শাহিন আলম সরাসরি চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং মাহফুজ তাকে যাতায়াতে সহায়তা করছিল। অল্প বয়সী তরুণরা দ্রুত টাকা উপার্জনের লোভে এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় সচেতন মহলকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। বিজিবি এই আসামিদের মালামালসহ শিবগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে চোরাচালান বিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে।
চলতি জুলাই মাসে ৫৩ বিজিবি সীমান্তে অপরাধ দমনে ব্যাপক সক্রিয় ছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই এক মাসেই তারা বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৩ জন চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি মোট ৬৬টি ভারতীয় মোবাইল ফোন জব্দ করেছে বিজিবি। এর মধ্যে ৫৫টি মোবাইল ফোন নিয়ম অনুযায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জ কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১১টি ফোন সংশ্লিষ্ট থানায় আলামত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বিজিবির এই কঠোর অবস্থানের কারণে গত মাসের তুলনায় সীমান্তে চোরাচালান প্রায় ১৫% কমেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি এই অভিযানের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। ভারত থেকে পুশ-ইন প্রতিরোধ, মাদক চোরাচালান এবং শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা যেকোনো পণ্য জব্দ করতে আমরা ১০০% তৎপর রয়েছি। তিনি আরও বলেন, চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে, কিন্তু আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা তাদের সব পরিকল্পনা নসাৎ করে দিচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই ধরনের অভিযান সামনের দিনগুলোতেও নিয়মিত চলবে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ বিজিবির এই সাহসী ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধ হলে দেশের অর্থনীতি আরও মজবুত হবে। বিশেষ করে ভারতীয় মোবাইল ও ইলেকট্রনিক পণ্য অবৈধভাবে বাজারে আসার কারণে দেশীয় বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। বিজিবির নিয়মিত টহল ও কড়া নজরদারির ফলে এই চক্রগুলো এখন কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে কাজ করলে সীমান্ত এলাকা অপরাধমুক্ত রাখা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
















