রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক বিশাল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গতকাল প্রতিষ্ঠানটির মতিঝিল প্রধান শাখা, বনশ্রী এবং মুগদা এই তিনটি ক্যাম্পাসে একযোগে এই পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। গভর্নিং বডির নবনিযুক্ত সভাপতি এ কে মোস্তাফিজুর রহমান হিরু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যুগে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম জাগ্রত করাই এই বিশাল উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সরকার নিযুক্ত অধ্যক্ষ, অভিজ্ঞ শিক্ষক লাল মোহাম্মদ, প্রতিষ্ঠানের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান এবং গভর্নিং বডির অভিভাবক প্রতিনিধি মোঃ রিয়াজউদ্দীন। এছাড়া শিক্ষকদের প্রতিনিধি শরীফ সামসুজ্জোহাসহ প্রতিষ্ঠানের কয়েক শ’ সিনিয়র শিক্ষক ও অদম্য উৎসাহী শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনে অংশ নেন। নতুন চারা হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা প্রতিজ্ঞা করেছে যে, শুধু গাছ লাগানোই নয়, প্রতিটি চারার বেড়ে ওঠা পর্যন্ত তারা এর দেখাশোনা করবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ও গভর্নিং বডির সভাপতি এ কে মোস্তাফিজুর রহমান হিরু শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এক অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি একটি চমৎকার গাণিতিক হিসাব তুলে ধরে বলেন, “আমাদের এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৩০,০০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এছাড়া আমাদের ১,০০০ জনেরও বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন। আমরা যদি প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর শপথ নিই, তবে আমরা একদিনেই প্রায় ১ লাখ গাছ রোপণ করতে পারব।” তাঁর এই কথায় উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে সমর্থন জানান। তিনি মনে করেন, এই বিশাল বনায়ন শহরের অক্সিজেন সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখবে।
সভাপতি হিরু শুধু স্কুলেই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ পারিবারিক পরিমণ্ডলেও গাছ লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সচেতন অভিভাবককে নিজ বাড়ির আঙিনায় বা বারান্দায় অন্তত ২টি করে বৃক্ষ রোপণ করার বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের হার যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা অন্তত ১.৫% থেকে ২% পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় গাছ লাগানো ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
পরিবেশগত সুবিধার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের অর্থনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরেন এ কে মোস্তাফিজুর রহমান হিরু। তিনি বলেন, বৃক্ষ আমাদের শুধু অমূল্য অক্সিজেনই দেয় না, বরং এটি একটি পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতেও সাহায্য করে। যেমন, একটি ফলদ গাছ বড় হলে সেখান থেকে পাওয়া ফল পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটায় এবং অতিরিক্ত ফল বাজারে বিক্রি করে আয় করা সম্ভব। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে ফলের রপ্তানি মূল্যও বেশ চড়া, যা থেকে বছরে কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। একটি ছোট্ট চারা ভবিষ্যতে বিশাল সম্পদে পরিণত হতে পারে, যা ১০০% নিশ্চিত।
অনুষ্ঠানে অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ বলেন, “আমরা আমাদের ৩টি ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ সবুজে ভরিয়ে দিতে চাই। নগর জীবনে ইট-পাথরের দালানের ভিড়ে শিক্ষার্থীরা যেন একটু সবুজের ছোঁয়া পায়, সেই চেষ্টাই আমরা করছি।” তিনি আরও জানান যে, রোপণকৃত গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিটি শাখায় একটি বিশেষ ‘গ্রিন টিম’ গঠন করা হবে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এই টিমের সদস্য হয়ে গাছের পরিচর্যা করবে। এতে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বাড়বে এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হবে।
গভর্নিং বডির অভিভাবক প্রতিনিধি মোঃ রিয়াজউদ্দীন বলেন, অভিভাবকেরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তারা বিশ্বাস করেন, পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত কাজে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। তিনি সব অভিভাবককে অনুরোধ করেন যেন তারা সন্তানদের মোবাইল গেমিং বা ইন্টারনেটের আসক্তি কমিয়ে সপ্তাহে অন্তত ০.৫% সময় হলেও বাগান করার কাজে উৎসাহিত করেন। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
সবশেষে, একটি ফলদ চারা রোপণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই উদ্যোগ কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো ঢাকা শহরের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন। যদি দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এভাবে উদ্যোগী হয়, তবে বাংলাদেশ আবারও চিরসবুজ শ্যামল দেশে পরিণত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারব।
















