আজ ২৮ জুলাই। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পাঁচ মাস পূর্ণ হলো আজ। এই বিশেষ দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে ‘ভালো’ ও ‘গভীর’ আলোচনা চলছে। তবে আলোচনার টেবিলে ইতিবাচক কিছু না এলে আবারও ‘খুব কঠোর সামরিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। তেহরানের সাফ কথা, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কিছু বার্তা আদান-প্রদান হলেও সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
গতকাল সোমবার পর্যন্ত টানা চার দিন ইরানে মার্কিন বিমান হামলা বন্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু গণমাধ্যম দাবি করেছে, যুদ্ধ চালাতে গিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীতে অস্ত্র ও গোলাবারুদের সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণেই তারা হামলা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। মিশিগানে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের তিনি জানান, মূলত মধ্যস্থতাকারী কয়েকটি দেশের বিশেষ অনুরোধেই তিনি হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমাদের কাছে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি গোলাবারুদ আছে। বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে সামরিকভাবে আমরা শক্তিশালী।’
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জেনারেল ড্যান কেইন মার্কিন সেনাবাহিনীর গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়া এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই আলোচনার পরই মূলত ইরানের ওপর হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন। এরপর থেকে ইরানও পাল্টা হামলা চালানো স্থগিত রেখেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনো তুঙ্গে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ তারা কোনোভাবেই ছাড়বে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, ওমানের সঙ্গে মিলে তারা একটি নতুন নৌ চলাচল ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছেন। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। গতকালও হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম না মেনে চলার চেষ্টা করায় ৬টি জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে ইরান। দেশটির দাবি, প্রণালির নিরাপত্তা ও সেবা ফি আদায়ের অধিকার একমাত্র তাদেরই।
গত ১৭ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল। সেখানে কথা ছিল ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা শেষ করে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর। কিন্তু হরমুজ প্রণালির দখল ও তদারকি নিয়ে নতুন করে ঝামেলা শুরু হওয়ায় সেই সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসছে। গত কয়েক দিনে টানা ১৩ রাত ইরানের ওপর ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই অভিযানের কার্যকারিতা এখন শেষের দিকে, কারণ হামলা করার মতো লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট এখন অনেক কমে গেছে।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৬২৪ জন। সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে। সিবিএস নিউজ ও ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৬% মার্কিন নাগরিক মনে করেন এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মানুষই দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান চান।
যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। গতকাল সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরাক থেকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এসব ড্রোন তাদের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদির তেল পরিবহন ব্যবস্থায় ড্রোন হামলার দাবি করেছে। এছাড়া জর্ডান ও ইরাকের কুর্দিস্তানেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে মধ্যপ্রাচ্য।
ট্রাম্প গতকাল মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানকে খুব বেশি সময় দেওয়া হবে না। হয় তারা দ্রুত আলোচনায় আসবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র কঠোরতম সামরিক হামলায় ফিরে যাবে। ট্রাম্প আরও জানান, ইরানকে স্যাটেলাইট ছবি দিয়ে রাশিয়ার সহায়তা করার বিষয়ে তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলবেন। তবে সংকটের এই পর্যায়ে আলোচনার পথ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে। কারণ তেহরান বারবার বলছে, তারা কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না।
















