র‍্যাব বিলুপ্ত নয়, নাম বদলে ফিরছে ‘এসআরএফ’: বহাল থাকছে সেনাসদস্যদের সুযোগ ও বিশেষ ক্ষমতা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

 দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে অপরাধ দমনে আলোচিত ও বিতর্কিত বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে এটি বিলুপ্তি নয়, বরং নাম ও আইনি কাঠামো পরিবর্তনের একটি বড় প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, র‍্যাব নামটি বদলে ফেলে ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স’ (এসআরএফ) অথবা ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) রাখা হবে। মূলত আন্তর্জাতিক মহলের চাপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো থেকে বাহিনীকে আড়াল করতে এই নতুন নামকরনের পথে হাঁটছে সরকার। নতুন খসড়া আইনে দেখা গেছে, বর্তমান র‍্যাবের প্রায় ৯০% থেকে ৯৫% কাঠামোই নতুন ইউনিটে অক্ষুণ্ণ রাখা হচ্ছে।

গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই আইনের খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ২০০৩ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইন’ পরিবর্তন করে এখন একটি স্বতন্ত্র ও নতুন আইন প্রণয়ন করছে মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত এই আইনে মোট ২৯টি ধারা এবং ৯টি অধ্যায় রাখা হয়েছে। যেখানে বাহিনীর গঠন, দায়িত্ব এবং সদস্যদের শাস্তির বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে। আগামী ২৯শে জুলাই সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে আরেকটি বড় সভা হবে, যেখানে এই আইনের চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করা হতে পারে। সরকারের লক্ষ্য হলো, এই বিশেষায়িত বাহিনীকে সরাসরি পুলিশের একটি শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে টিকিয়ে রাখা।

নতুন এই আইনের খসড়ায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো সদস্যদের উৎস। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোরালো দাবি ছিল এই বাহিনীকে পুরোপুরি সাধারণ পুলিশ সদস্যদের দিয়ে গঠন করার জন্য। কিন্তু খসড়া আইনে দেখা যাচ্ছে, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রেষণে সদস্য নেওয়ার সুযোগ আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, মাঠ পর্যায়ে বড় বড় অভিযানের সময় আগের মতোই সামরিক কর্মকর্তাদের দেখা যাবে। এই বিষয়টি নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, নিয়মিত আইন প্রয়োগের কাজে সামরিক সদস্যদের রাখা হলে নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সরকার এই কাঠামোর কোনো পরিবর্তন চায় না।

নতুন এসআরএফ বা এসআরবি কেবল আসামি ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবে না। তারা এখন থেকে নির্দিষ্ট কিছু মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার ক্ষমতাও পাবে। এর আগে র‍্যাব সাধারণত মামলার তদন্ত করার সুযোগ পেত না, তারা শুধু অভিযান চালিয়ে আসামি ও মালামাল ধরত। এখন খসড়া আইনে বলা হয়েছে, পুলিশের উপ-পরিদর্শক বা তার ওপরের পদের কর্মকর্তারা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে পারবেন। এছাড়া পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও আগের মতোই থাকছে। বিশেষ করে মাদক উদ্ধার, সাইবার অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রুখতে এই বাহিনী ১০০% স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। তবে সব কাজই হবে পুলিশের মহাপরিচালকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে।

র‍্যাবের কাজের পরিধি নিয়েও বৈঠকে গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে র‍্যাব সারা দেশে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তবে নতুন প্রস্তাবে আলোচনা এসেছে যে, এদের কার্যক্রম কেবল বড় বড় মহানগর এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ রাখা যায় কি না। কিন্তু এই প্রস্তাব নিয়ে অনেক কর্মকর্তার মনে প্রশ্ন আছে। কারণ জেলা পর্যায়ের পুলিশে জনবলের অনেক ঘাটতি থাকে, ফলে সেখানে অপরাধ দমনে বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন বেশি হয়। শেষ পর্যন্ত এই বাহিনীর কাজের এলাকা আগের মতো সারা দেশেই বিস্তৃত থাকতে পারে। অর্থাৎ জেলার পুলিশ যেখানে অক্ষম, সেখানেই এই বিশেষ ফোর্সকে ব্যবহার করা হবে।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলে আসছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন আইনে একটি ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ৫ সদস্যের এই কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকবেন। কিন্তু মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা হলো, কমিটির চারজনই যদি সরকারি কর্মকর্তা হন, তবে সাধারণ মানুষের করা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া খুবই কঠিন। মানবাধিকার কর্মী নূর খান মনে করেন, শুধু বাহিনীর পোশাক বা নাম বদলালেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হবে না; বরং কাজের ধরনে স্বচ্ছতা এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক দলগুলোও র‍্যাবের এই রূপান্তর নিয়ে কড়া নজর রাখছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে সরাসরি র‍্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বাহিনীকে ঢেলে সাজিয়ে নতুন আইনি কাঠামোয় আনার পক্ষপাতি। প্রস্তাবিত কাঠামো কার্যকর হলে র‍্যাব নামটি হারিয়ে গেলেও বাহিনীর সব সদস্য, স্থাপনা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম নতুন এই ইউনিটের অধীনে চলে যাবে। অর্থাৎ এটি কার্যত র‍্যাবের নাম পরিবর্তন ও পুনর্গঠন মাত্র। এখন দেখার বিষয়, নাম বদলানোর পর এই বাহিনীর ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তারা কতটুকু সচেতন থাকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ