শাহিন আখন, বোরহানউদ্দিন (ভোলা): ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নে এক সময় যে ‘জ্বীন-ভূত’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আর রহস্য ছিল, সেই একই আতঙ্কের ছায়া এখন খোদ বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডে জেঁকে বসেছে। তবে এই ‘জ্বীন-ভূত’ কোনো অলৌকিক আত্মা নয়, বরং এটি অনলাইন জুয়া, আইপিএল বেটিং এবং মাদকের একটি ভয়ংকর সিন্ডিকেটের নাম। স্থানীয়রা এই মরণনেশাকেই এখনকার দিনে ‘জ্বীন-ভূত’ বলে ডাকছেন, কারণ এটি অদৃশ্যভাবে মানুষের পকেটের টাকা এবং জীবনের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে এই চক্রের খপ্পরে পড়ে বোরহানউদ্দিনের প্রায় ৮০% মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় কাচিয়া ইউনিয়ন ছিল এই জুয়াড়ি চক্রের প্রধান আস্তানা। সেখানে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর চক্রটি এখন পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী কিশোর এবং বেকার যুবকদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেট তাদের জাল বিস্তার করছে। বর্তমানে এই ওয়ার্ডের উঠতি বয়সী ছেলেদের প্রায় ৭০% পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে স্মার্টফোনে অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকছে। তাদের কাছে এখন বই-খাতার চেয়ে বেটিং সাইট আর অনলাইন ক্যাসিনো অ্যাপগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আসক্তির কারণে এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
এই জুয়ার নেশায় পড়ে সাধারণ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের চাষের জমি কিংবা লালন-পালন করা গবাদি পশু বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়েছে। স্থানীয় এক ভুক্তভোগী পিতা চোখের জল মুছে বলেন, “আমার ছেলে জুয়ার টাকা জোগাড় করতে ঘরের ফ্রিজ আর আমার স্ত্রীর সোনার চেইন পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে। এখন আমরা দেনার দায়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছি।” অভিযোগ উঠেছে, একেকটি অনলাইন অ্যাপে বা আইপিএল বেটিংয়ে একেকজন কিশোর গড়ে ৫০০ থেকে ৩০০০ ডলার ($৩০০০) পর্যন্ত হেরে যাচ্ছে। এই বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতি সামলাতে না পেরে অনেক পরিবার এখন এলাকা ছেড়ে পালানোর পথ খুঁজছে।
জুয়া আর মাদকের এই বিষাক্ত মিলনমেলা থেকে জন্ম নিচ্ছে ভয়ংকর ‘কিশোর গ্যাং’। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এই কিশোরেরা প্রথমে নিজের ঘরে চুরি করে এবং পরে পাড়া-মহল্লায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছে। পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা এখন সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে ভয় পান। তাদের মতে, এলাকায় মাদক কেনাবেচা এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত আগের চেয়ে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% বেড়ে গেছে। শহরের অলিগলিতে রাত বাড়লেই বখাটে কিশোরদের জটলা দেখা যায়, যাদের কাজই হলো মাদকের আদান-প্রদান এবং জুয়ার আসর বসানো। স্থানীয়রা বলছেন, এদের এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সমাজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
তদন্তে দেখা গেছে, এই ‘জ্বীন-ভূতের’ আড়ালে মূলত কিছু প্রভাবশালী শক্তিশালী চক্র কাজ করছে যারা আড়ালে থেকে এই কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন যে, তাদের সন্তানরা যখন জুয়ায় হেরে ঋণে জর্জরিত হয়, তখন এই সিন্ডিকেটই তাদের মাদকের বাহক বা ডিলার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে একদিকে যেমন পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সমাজের অস্থিরতা। এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা সমাজ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা একটি জাতির জন্য অশনি সংকেত।
পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের অভিভাবক মহল ও সচেতন নাগরিকরা এখন প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। এখনই যদি এই জুয়া আর মাদকের চক্রটি সমূলে উৎপাটন করা না হয়, তবে বোরহানউদ্দিনের প্রতিটি ঘরে কান্নার রোল পড়বে। স্থানীয় এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সোনার ছেলেরা স্মার্টফোনের নেশায় ডুবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা জুয়া খেলে লাখ লাখ টাকা ওড়াচ্ছে, অথচ ঠিকমতো নিজের নামও লিখতে পারছে না।” প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর দাবি, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই কথিত ‘জ্বীন-ভূত’ সিন্ডিকেটের হোতাদের যেন দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়।
বোরহানউদ্দিনের এই সামাজিক সংকট কাটাতে হলে কেবল পুলিশের ওপর ভরসা করলেই চলবে না, বরং পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে যাতে তাদের সন্তানরা স্মার্টফোনের আড়ালে কার সাথে মিশছে বা কী করছে তা তদারকি করা যায়। এলাকার মানুষের প্রত্যাশা, বোরহানউদ্দিন পৌরসভা খুব দ্রুতই এই ‘জ্বীন-ভূতের’ ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি পাবে এবং ফিরে পাবে তার হারানো স্নিগ্ধতা। মাদক ও জুয়ামুক্ত সুন্দর সমাজ গড়তে এখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। নতুবা এই আগ্নেয়গিরির লাভা অচিরেই পুরো উপজেলাকে গ্রাস করবে।
















