শৈলকুপায় ইছহাক হোসেনের ভোলবদল: আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতা কাটিয়ে বিএনপিতে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় উত্তপ্ত রাজনীতি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

 গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্যের পর ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের হাওয়ায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নে বইছে এক নতুন বিতর্কের ঝড়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মাধবপুর গ্রামের বাসিন্দা ইছহাক হোসেন। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে সখ্যতা বজায় রাখা এই ব্যক্তি এখন ভোল পাল্টে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এলাকার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আড্ডা সবখানেই এখন ইছহাক হোসেনের ‘ভোলবদল’ নিয়ে কানাঘুষা চলছে। প্রায় ৮০% স্থানীয় মানুষের মতে, এই ধরনের অনুপ্রবেশ দলের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ইছহাক হোসেন ছিলেন দলটির প্রভাবশালী নেতাদের অন্যতম ছায়াসঙ্গী। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও শৈলকুপা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এম. আব্দুল হাকিম আহমেদ এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা আরিফ রেজা মন্নুর সাথে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি এলাকায় নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ১০-১২ বছরে শৈলকুপার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এবং সালিশ-বাণিজ্যে তার পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। স্থানীয়রা বলছেন, সে সময় ইছহাক হোসেনকে ছাড়া এলাকায় কোনো বড় কাজ সম্পন্ন হতো না। বিশেষ করে মনোহরপুর ইউনিয়নের প্রায় ৯০% রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকত বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন।

এলাকার বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ ইছহাক হোসেনের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি হামলা, চাঁদাবাজি এবং মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে ইন্ধন জুগিয়েছেন। এলাকার সাধারণ মানুষ তার প্রভাবের ভয়ে এতদিন মুখ না খুললেও এখন পটপরিবর্তনের পর তারা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজের আখের গোছাতে এলাকার দরিদ্র মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন এবং বিচার-আচারের নামে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। যদিও এসব অভিযোগের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি নথি বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি, তবুও জনমনে তার ভাবমূর্তি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় তার বিরুদ্ধে কেউ মামলা করার সাহস পায়নি, ফলে অভিযোগগুলো নথিবদ্ধ হয়নি।

রাজনৈতিক এই পটপরিবর্তনের পর ইছহাক হোসেনের কৌশল বদলে গেছে বলে দাবি করছেন এলাকাবাসী। ৫ই আগস্টের পর তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে তোলা কয়েকশ ছবি সরিয়ে ফেলেছেন। এখন তাকে নিয়মিত বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিলে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, শৈলকুপা উপজেলা দলিল লেখক সমিতির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার জন্য তিনি জোরালো লবিং শুরু করেছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। তারা মনে করছেন, ইছহাক হোসেনের মতো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের দলে জায়গা দিলে দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুম সহ্য করা ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হবে। প্রায় ৭০% ত্যাগী কর্মী মনে করেন, এমন অনুপ্রবেশ ঘটলে দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে।

এই বিষয়ে মনোহরপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মোহন কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা গত ১৭ বছর ধরে রাজপথে আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লড়াই করেছি। আজ যখন দল সুসময়ে আছে, তখন ইছহাক হোসেনের মতো হাইব্রিড নেতাদের অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যারা বিগত দিনে আওয়ামী লীগের দালালি করেছে, তারা এখন বিএনপির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে চাইছে। আমরা চাই দলের হাইকমান্ড এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিক। নতুবা দলের ভেতরে ১০০% বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।” তার এই বক্তব্যের পর সাধারণ কর্মীদের মধ্যে উত্তাপ আরও বেড়েছে এবং ইছহাক হোসেনকে প্রতিহত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইছহাক হোসেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে সব কথা বলা হচ্ছে তার ৯০% ই মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি অতীতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করেছি। গত ১৭ বছরে আমার নামে কোনো রাজনৈতিক মামলা হয়নি বা আমি কোনো অন্যায়ের সাথে যুক্ত ছিলাম না। আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে সবার সাথে মেলামেশা করি, তার মানে এই নয় যে আমি অন্য দলের লোক। একটি মহল আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।” তিনি আরও দাবি করেন, তিনি কোনো ছবি মুছে ফেলেননি এবং দলের প্রতি তার আনুগত্য সব সময় ছিল।

শৈলকুপার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘটনা কেবল ইছহাক হোসেনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে দলের স্বার্থে এই ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো জরুরি। তারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক সুবিধাবাদী ব্যক্তি নিজেদের বাঁচানোর জন্য দল পরিবর্তন করেন। এদের ব্যক্তিগত আমলনামা এবং বিগত ১৭ বছরের কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তৃণমূলের দাবি, দলের নীতি ও আদর্শ বজায় রাখতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ