চুপ্পুর রাজকীয় বিদায়েও কাটছে না ধোঁয়াশা: ঝড় তোলা রাষ্ট্রপতির আড়ালে কী ছিল?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

অঞ্জন দত্তর সেই বিখ্যাত গান ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ?’ শুনলে এখন হয়তো অনেকেরই একটু মায়া হবে। সামান্য ১১০০ টাকার বেতনের একটা চাকরি পাওয়ার আনন্দে লোকটা বছরের পর বছর ‘টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন’ নম্বরে ফোন করে বেলা বোসের কান ঝালাপালা করে দিয়েছেন। অথচ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় এবং রুদ্ধশ্বাস চাকরি, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির পদটি অবলীলায় ছেড়ে দিলেন জনাব মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। কিছুদিন আগে তিনি বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন নিজের শরীর পরীক্ষা করতে। সেখানে ধরা পড়ল এক অদ্ভুত অসুখ। আর সেই শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণ দেখিয়েই তিনি দেশের সর্বোচ্চ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। তবে এই ইস্তফা কি শুধুই অসুস্থতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো হিসাব-নিকাশ?

সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর এই অসুখটি গরিবি আমাশয় বা সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়। এটি বেশ ‘এলিট’ বা অভিজাত ঘরানার একটি রোগ, যার নাম ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’। এই রোগের লক্ষণ বড় বিচিত্র। তিনি হুটহাট অজ্ঞান হয়ে যান, আবার চট করে জ্ঞান ফিরে পান। মুশকিল হলো, যখন তিনি বেহুঁশ থাকেন, সেই সময়ের কথা জ্ঞান ফেরার পর তার আর মনে থাকে না। এমন একটি অটোনোমাস বডির দায়িত্বে থেকে যদি কেউ হুটহাট ব্ল্যাংক হয়ে যান, তবে সেটি রাষ্ট্রের জন্য ১০০% ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তিনি নিজের হৃদযন্ত্রের বাইপাস সার্জারি এবং এই নিউরোপ্যাথি সমস্যার কথা উল্লেখ করে একটি সুলিখিত ইস্তফাপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজনে এই পদের গুরুভার পালন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রপতির এই চাকরিটা পেতে তাকে কোনো ইন্টারভিউ দিতে হয়নি, কোনো লবিং করারও প্রয়োজন পড়েনি। সাহাবুদ্দিন নিজেই একবার বলেছিলেন, তার কপালে আল্লাহ এত বড় জিনিস লিখে রেখেছিলেন যে, সেটি তার কল্পনাতেও ছিল না। এমনকি তার বাবা-মা বেঁচে থাকলেও হয়তো ভাবতে পারতেন না তাদের ছেলে একদিন রাষ্ট্রপতি হবে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন কাকে কোথায় বসাতে হবে। অনুগত লোক চেনার ক্ষেত্রে হাসিনা বরাবরই পটু ছিলেন। চুপ্পু পরে খোলাখুলি বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিন মাস তিনি হাসিনাকে সালাম করতে গেলে হাসিনা সালাম নিতেন না, বরং পা সরিয়ে নিতেন। তখন তিনি ভেবেছিলেন হাসিনা তার ওপর বিরক্ত, কিন্তু পরে বুঝেছেন রাষ্ট্রপতি বানাবেন দেখেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী একটু দূরত্ব রাখছিলেন।

চুপ্পুর এই উত্থানের পেছনে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যই ছিল না, বরং এস আলম গ্রুপের মতো বড় করপোরেট হাউসের ছায়াও ছিল বলে বাজারে জোর গুঞ্জন রয়েছে। বিচারক থাকা অবস্থা থেকেই তার নামের চেয়ে বদনাম ছিল বেশি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হওয়ার পর সেই বদনামের পাল্লা যেন আরও ভারী হয়। এক সময় তিনি এস আলমের কবজায় থাকা ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শোনা যায়, এস আলমের জোর তদ্বিরেই তিনি বঙ্গভবনের ‘সোনার খাঁচায়’ ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলেন। একবার পাবনায় ভাষণ দিতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন তিনি। এসএসএফ সদস্য যখন তাকে থামতে বললেন, তিনি দম্ভ করে বলেছিলেন, “ঝড় উঠছে উঠুক, আমিই তো এখানে ঝড় উঠাচ্ছি!” আসলেই তিনি বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে দুদক আর ব্যাংকিং সেক্টরে কম ঝড় তোলেননি।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর মহাপ্রলয়ে যখন আওয়ামী লীগ সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, তখন চুপ্পু জাতিকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই তিনি ভোল পাল্টে ফেললেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, পদত্যাগের কথা তিনি শুনেছেন কিন্তু কোনো লিখিত কাগজ তার কাছে নেই। তার এই দ্বিমুখী কথায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। অনেকে তার পদত্যাগ দাবি করে বঙ্গভবন ঘেরাও করেছিলেন। পরিস্থিতি কোনোভাবে সামলে নিলেও তার বিশ্বস্ততা নিয়ে মানুষের মনে ১০০% সন্দেহ দানা বাঁধে। সম্প্রতি লন্ডন থেকে শেখ হাসিনার সাথে তার টেলিফোনে কথা বলার খবর ফাঁস হওয়ার পরই তিনি এই হঠাৎ অসুস্থতার কার্ড খেলে পদত্যাগ করলেন।

এখন প্রশ্ন উঠছে, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর এই রাজকীয় বিদায়ে কি তার সব অপরাধ ঢাকা পড়ে যাবে? তিনি হয়তো মনে করছেন সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকালীন কাজের জন্য তিনি দায়মুক্তি পাবেন। কিন্তু আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। দুবাইয়ে অবৈধভাবে টাকা পাচার কিংবা মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ গড়ার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে এই দায়মুক্তি কোনো কাজেই আসবে না। দেশের বাইরে তার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) পাচারের যে তথ্য চাউর হয়েছে, সেটির বিচার এই সাংবিধানিক দায়মুক্তির আওতার বাইরে। ফলে তার এই পদত্যাগ ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ মনে হলেও এটিই কি শেষ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূচনা?

চুপ্পু সাহেব যখন রাষ্ট্রপতি হলেন, তখন অনেকে ভেবেছিলেন তিনি হয়তো নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু দেখা গেছে, তিনি সবসময় শেখ হাসিনার ‘চরণের ধুলার’ দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। যে লোক প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁয়ে সালাম করতে না পেরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ভোগেন, তার কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা হয়তো ভুল ছিল। তার শাসনামলে দেশের বিচার বিভাগ ও আর্থিক খাতে যে অরাজকতা চলেছে, তার দায়ভার তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের মতো ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা এখন টক অফ দ্য টাউন। ১০০% দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে হলে সাহাবুদ্দিনের মতো ব্যক্তিদের অতীত আমলনামা খতিয়ে দেখা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদত্যাগ করে হয়তো আপাতত নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। কিন্তু জনগণের আদালতে তার বিচার শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। রাষ্ট্রপতির পদটি অলংকারিক হলেও তার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই পদের অমর্যাদা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, তাদের পালানোর পথ খুব একটা প্রশস্ত নয়। অটোনোমিক নিউরোপ্যাথির দোহাই দিয়ে তিনি হয়তো সাময়িক অচেতনতার ভান করতে পারেন, কিন্তু দেশের জাগ্রত জনতা সব মনে রেখেছে। তার এই বিদায় যেমন নাটকীয় ছিল, সামনের দিনগুলো হয়তো তার চেয়েও বেশি রুদ্ধশ্বাস হবে। চুপ্পুর ঝড় থামলেও সেই ঝড়ের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে রাষ্ট্রকে আরও অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ