ভারতের ‘তেলাপোকা’দের বড় জয়: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও কেন্দ্রের আশ্বাসে আন্দোলন প্রত্যাহার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের রাজপথ কাঁপানো ‘তেলাপোকা’দের আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করল নরেন্দ্র মোদির সরকার। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট আশ্বাসের পর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। আজ শনিবার (২৫ জুলাই ২০২৬) নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস। এর মাধ্যমেই গত কয়েক মাস ধরে চলা ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রের অন্যতম বড় অস্থিরতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। সিজেপি নেতারা জানিয়েছেন, তারা সরকারের ওপর ‘আস্থা রেখে’ এবং দেশের স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করে রাজপথ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আন্দোলনের মূল বিজয় এসেছে যখন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। এই পদত্যাগ ছিল আন্দোলনকারীদের প্রধান এবং অনড় দাবি। নিট (NEET) মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়বদ্ধতা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান লিখেছেন, গত ১০ দিনের ঘটনাবলীতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত মর্মাহত এবং দেশের বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। তার এই পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ভারতের জয়পুর, পাটনা এবং দিল্লির রাজপথে সিজেপি সমর্থকরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন— ‘তেলাপোকা জিতেছে, গণতন্ত্র জিতেছে।’

সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, “সরকার আমাদের সবকটি দাবি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে রাজি হয়েছে। বিশেষ করে নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর মানসিক চাপে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, তাদের পরিবারের জন্য কেন্দ্র সরকার দ্রুত ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করবে।” কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডাও সরকারের পক্ষে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আইনি ব্যবস্থা বা মামলা করা হবে না। এই ঘোষণার ফলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ওপর থেকে মামলার খড়গ নেমে গেল। সরকার জানিয়েছে, তারা শিক্ষাব্যবস্থায় ১০০% স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।

এদিকে, প্রশ্ন ফাঁস রোধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই কড়া বার্তা দিয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধ রুখতে পার্লামেন্টের আগামী অধিবেশনেই একটি অত্যন্ত কঠোর আইন আনা হচ্ছে। এই নতুন আইনে দোষীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) টাকা পর্যন্ত জরিমানার শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-তে বড় ধরণের রদবদল আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংস্থাটির ৪৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সরকারের এই দ্রুত পদক্ষেপগুলো সিজেপি নেতাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

এই আন্দোলনের জন্মকাহিনি ছিল বেশ অদ্ভুত ও বিদ্রূপাত্মক। গত ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সাথে তুলনা করে একটি মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্য থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে থাকা ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি গঠন করেন। অভিজিৎ আজ দিল্লির যন্তর মন্তরের মঞ্চ থেকে প্রধান বিচারপতিকে এক হাত দেখে নিয়েছেন। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “প্রধান বিচারপতিকে ধন্যবাদ, তিনি যদি আমাদের তেলাপোকা বলে গালি না দিতেন, তবে আমি ভারত আসতাম না আর এই আন্দোলনও সফল হতো না।” অভিজিতের এই জেন-জি (Gen-Z) স্টাইলের প্রতিবাদ সারা ভারতের তরুণদের মধ্যে ১০০% সাড়া ফেলেছিল।

আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আগামীকাল রোববার সারা ভারতে মোমবাতি মিছিলে ডাক দিয়েছে সিজেপি। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে বিহারের অন্তত ৩টি জেলায় পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সময় পাটনা ও অন্যান্য শহরে পুলিশ ব্যাপক লাঠিপেটা করে এবং পাথর ছোড়ার ঘটনায় পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জনশক্তি জনতা দলের নেতা তেজ প্রতাপ যাদবকেও সেই সময় আটক করা হয়েছিল। এই ধরণের পুলিশি নির্মমতার স্মৃতি এখনো আন্দোলনকারীদের মনে তাজা। তাই পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি তারা শোকাতুর পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে চায়।

বিগত মে মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলেন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি টানা ২৬ দিন অনশন করার পর চলতি সপ্তাহে তার কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। ওয়াংচুকের অনশন ভারতের অন্তত ৮০% সচেতন নাগরিককে এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল। ভারতের বিহার বনধের মতো কঠোর কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকারের টনক নড়ে এবং তারা আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়। সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে মনে করেন, এটি কেবল তেলাপোকাদের জয় নয়, এটি ভারতের প্রতিটি সাধারণ শিক্ষার্থীর জয়।

ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা মোদি সরকারের জন্য একটি বড় শিক্ষা। তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে অবজ্ঞা করলে যে বড় মাসুল গুনতে হয়, তা এই আন্দোলনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ কোটি টাকার জরিমানার আইনটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। তবে আন্দোলনকারীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যদি সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে ০.১% ও সরে আসে, তবে তারা আবার রাজপথে নামতে দ্বিধা করবে না। আপাতত ভারতের রাজপথ থেকে বিক্ষোভের মেঘ সরে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা আবার ক্লাসরুমে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ