রাজধানীর মিরপুরে গত শুক্রবার রাতে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ (৪৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অভ্যন্তরীণ চরম কোন্দল। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এই খুনের মিশন সফল করতে ঝিনাইদহ থেকে ৪ জন পেশাদার ভাড়াটে খুনিকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃত চঞ্চল মোল্যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে স্থানীয় নেতাদের দ্বন্দ্ব থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। যদিও ইউসুফ আলী পারভেজ প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু খুনিদের মূল লক্ষ্য বা ‘টার্গেট’ তিনি ছিলেন না।
ঘটনাটি ঘটে মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকায় শুক্রবার রাতে। কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর বাসার পাশের একটি চায়ের দোকানে তখন আড্ডা দিচ্ছিলেন একদল যুবদল কর্মী। হুট করেই সেখানে হামলা চালায় সশস্ত্র চার যুবক। এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইউসুফ আলী পারভেজ। এছাড়া মনির হোসেন নামের এক যুবদল কর্মী এবং সালাম সরদার নামের এক সাধারণ সবজি বিক্রেতা গুরুতর আহত হন। পুলিশের তথ্যমতে, খুনিদের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন হাফিজুল ইসলাম বাবু। তাকে সরিয়ে দিতে পারলেই এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখা সহজ হতো এবং নির্বাচনের পথ পরিষ্কার হতো—এমন ভাবনা থেকেই ১০০% পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়।
গ্রেফতারকৃত চঞ্চল মোল্যাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, খুনের ৪ দিন আগে তারা চারজন ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসে। তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে। ভাড়ায় আসা এই খুনিদের খরচ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও টাকার সঠিক পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়, তবে ধারণা করা হচ্ছে কয়েক লক্ষ টাকার একটি চুক্তি হয়েছিল। খুনিরা ঢাকায় আসার পর অন্তত দুই দিন হাফিজুল ইসলাম বাবুর বাড়ি এবং তার ব্যক্তিগত কার্যালয় ‘রেকি’ বা পর্যবেক্ষণ করে। তারা হাফিজুলের গতিবিধি সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই শুক্রবার রাতে হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়ার সময় হাফিজুল ও তার কর্মীরা হঠাৎ দুজন অপরিচিত লোককে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখেন। ইউসুফ আলী পারভেজ যখন এগিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চান, তখনই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইউসুফ যখন একজনকে জাপটে ধরার চেষ্টা করেন, তখন ওই যুবক কোমর থেকে পিস্তল বের করে সরাসরি ইউসুফের বুকে গুলি চালায়। এরপর হাফিজুলকে লক্ষ্য করে আরও কয়েকটি গুলি ছোড়া হয়। তবে হাফিজুল দ্রুত মাটিতে শুয়ে পড়ায় তার শরীরে গুলি লাগেনি, কিন্তু পাশে থাকা মনির ও সবজি বিক্রেতা সালাম আহত হন। স্থানীয়রা সাহসিকতার সাথে ধাওয়া দিয়ে চঞ্চল মোল্যাকে একটি পিস্তলসহ ধরে ফেলে, বাকি তিনজন ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়।
পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, হামলাকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে হাফিজুলের বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়েছিল। ঘটনার পর কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার বাদী হয়ে একটি অস্ত্র মামলা করেছেন এবং নিহত ইউসুফের ভাই মাসুদ রানা একটি হত্যা মামলা করেছেন। দুই মামলাতেই চঞ্চলসহ আরও তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন জিহাদ মোল্লা (৩৪), জিয়ারুল মোল্লা (৩৯) ও হাসান (৩৫)। চঞ্চলকে শনিবার আদালতে হাজির করে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পুলিশ মনে করছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই খুনের পেছনের মূল হোতা বা ভাড়াদাতাদের নাম বেরিয়ে আসবে।
মিরপুরের স্থানীয় রাজনীতির খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইদানীং বিএনপি ও যুবদলের মধ্যে পকেট কমিটি গঠন এবং আগামী নির্বাচনের টিকেট পাওয়া নিয়ে ২০% থেকে ৩০% নেতার মধ্যে চরম বিরোধ চলছে। সম্প্রতি পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়া খুন হওয়ার ঘটনাটিও এই কোন্দলেরই অংশ বলে অনেকে মনে করছেন। হাফিজুল ইসলাম বাবু নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এলাকায় তার বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তাই প্রতিপক্ষের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে খুনিরা ইউসুফকে কেন মারল, তার জবাবে পুলিশ বলছে, খুনের মিশনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় ইউসুফকে প্রথম গুলিটি করা হয়।
এই ঘটনার পর ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ঘটনার তদন্ত পর্যবেক্ষণ করছে। যদি যুবদলের কোনো নেতার এই হত্যাকাণ্ডের সাথে ০.০১% (সামান্যতম) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে নিহত ইউসুফের পরিবার এখন বিচারের আশায় বুক বেঁধেছে। তার ভাই মাসুদ রানা বলেন, “আমার ভাই কোনো অন্যায় করেনি, সে শুধু নেতার সাথে চলাফেরা করত। ভাড়াটে খুনিদের ঝিনাইদহ থেকে এনে কেন আমার ভাইকে মারা হলো, আমরা তার বিচার চাই।” মিরপুর এলাকায় এই ঘটনার পর থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, “আমরা ইতোমধ্যে ১ জনকে গ্রেফতার করেছি এবং অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। ঝিনাইদহ থেকে খুনিদের আনার বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই পলাতক বাকি ৩ জনকেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।” পুলিশের বিশেষ কয়েকটি দল এখন ঢাকার বাইরেও অভিযান পরিচালনা করছে। মিরপুরবাসী আশা করছে, রাজনৈতিক লেবাসে যারা ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছে, তাদের যেন কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হয় যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
















