আমাদের দেশে সরকারি প্রকল্পের কাজ মানেই যেন বরাদ্দকৃত অর্থ শেষ হয়ে যাওয়া, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ না হতেই আরও অর্থের দাবি জানানো হয়। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো এবং অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ঘটনা। পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার সরকারি প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শেষ করেও অতিরিক্ত ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৪ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে এক বিরল সততার পরিচয় দিয়েছেন। তার এই মহতী উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে পীরগঞ্জের আকাশ-বাতাস এখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা সবাই বলছেন, এমন সৎ কর্মকর্তা যদি প্রতিটি উপজেলায় থাকত, তবে দেশের চেহারা পাল্টে যেত।
ঘটনাটি মূলত পীরগঞ্জ উপজেলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কৃষিকাজে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। মোট ১৩.৫ কিলোমিটার (সাড়ে ১৩ কিলোমিটার) দীর্ঘ দুটি খাল পুনঃখনন করার দায়িত্ব ছিল উপজেলা প্রশাসনের ওপর। ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিয়ে কোনো আপস করেননি। তিনি নিয়মিত নিজে উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের কাজ তদারকি করেছেন এবং প্রতিটি ধাপে ১০০% স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছেন। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয় এবং খালের নাব্যতা পুরোপুরি ফিরে আসে।
সাধারণত দেখা যায়, কোনো সরকারি প্রকল্পের কাজ শেষে এক টাকাও অবশিষ্ট থাকে না, উল্টো বাজেট ঘাটতির দোহাই দেওয়া হয়। কিন্তু পীরগঞ্জের এই খাল খনন প্রকল্পে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। প্রকল্পের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ছিল, তা থেকে সাশ্রয় করে ইউএনও মোট ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৪ টাকা সরকারি তহবিলে জমা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসেবে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০,৬০০ মার্কিন ডলারের ($) সমান। সরকারি টাকা যে জনগণের আমানত এবং তা থেকে এক পয়সাও অনৈতিকভাবে খরচ করা উচিত নয়, সেটিই যেন হাতেনাতে প্রমাণ করলেন এই কর্মকর্তা। পীরগঞ্জের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এই টাকা ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে ইউএনও সাহেব প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা থাকলে সরকারি অর্থ অপচয় রোধ করা সম্ভব।
এই প্রকল্পটির ফলে এলাকার কৃষকরা ব্যাপক উপকৃত হবেন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাব এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতার যে সমস্যা ছিল, তা এখন ৯০% কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় তারা অনেকদিন ধরেই চাষাবাদে সমস্যায় ভুগছিলেন। এখন খাল খনন হওয়ার ফলে তারা নতুন করে সোনালি ফসলের স্বপ্ন দেখছেন। ইউএনওর এই সততা শুধু টাকা বাঁচায়নি, বরং সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসনের প্রতি আস্থাও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এলাকার অন্তত ৮০% মানুষ মনে করেন, এই ধরণের কাজের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা বদলে যাবে।
পীরগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই ঘটনায় অবাক ও আনন্দিত। তারা বলছেন, আমরা আগে অনেক কাজ দেখেছি যেখানে বরাদ্দের সব টাকা খরচ হওয়ার পরেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেত। কিন্তু এবার চিত্রটা ভিন্ন। কাজ হয়েছে একদম মানসম্মত, আর টাকাও বেঁচেছে অনেক। ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার কাজের শুরুতে যে অঙ্গীকার করেছিলেন, সেটি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তার এই পদক্ষেপ শুধু ঠাকুরগাঁওয়ে নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে থাকবে। এই উদ্যোগের ফলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
নিজের এই মহতী কাজের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কথা বলেছেন। তিনি জানান, “আমি কোনো অসাধারণ কাজ করিনি, শুধু আমার ওপর অর্পিত দায়িত্বটি সততার সাথে পালন করার চেষ্টা করেছি। সরকারি কোষাগারের প্রতিটি টাকা দেশের সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত। এই অর্থ আমানত হিসেবে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকল্পের কাজ শতভাগ মানসম্মতভাবে শেষ করার পর যে টাকা বাড়তি ছিল, তা ফেরত দেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।” তিনি আরও বলেন, স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ করলে যে কোনো প্রকল্পেই অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব, যদি সেখানে দুর্নীতির কোনো জায়গা না থাকে।
বর্তমান সময়ে যখন দুর্নীতির খবর আমাদের চারপাশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তখন পীরগঞ্জের এই খবরটি যেন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো শান্তি নিয়ে এসেছে। পীরগঞ্জের বিভিন্ন চা-দোকান থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবখানেই এখন ইউএনওর সততা নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয় যুবকরা বলছেন, আমরা এমন বাংলাদেশই দেখতে চাই যেখানে কর্মকর্তাদের পকেট ভারি করার চেয়ে সরকারি কোষাগার রক্ষা করা বড় হয়ে উঠবে। এই ঘটনার ফলে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর মানুষের নির্ভরতা এখন ১০০%। এই ইতিবাচক পরিবর্তনটি সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
উপসংহারে বলা যায়, পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার দেখিয়ে দিয়েছেন যে, দেশপ্রেম এবং সততা থাকলে সীমিত সম্পদের মধ্যেও সর্বোচ্চ উন্নয়ন সম্ভব। সাড়ে ১২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়তো অনেক বড় অঙ্কের কিছু নয়, কিন্তু এর পেছনে থাকা যে মানসিকতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা, তা অমূল্য। পীরগঞ্জের এই খাল পুনঃখনন প্রকল্পের সফলতা এবং অর্থ সাশ্রয়ের এই উদাহরণ দেশের অন্য ৩০০-এর বেশি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়লে কয়েক কোটি টাকা সরকারি তহবিলে বেঁচে যেত। আশা করা যায়, সরকারের এই জিরো টলারেন্স নীতি এবং সৎ কর্মকর্তাদের হাত ধরে আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত হবে।
















