ঝিনাইদহের এক শান্ত দুপুর। সাধারণ দিনগুলোর চেয়ে আজকের দিনটি একটু অন্যরকম ছিল বেড়াশুলা এতিমখানার শিশুদের কাছে। প্রতিদিনের সাধারণ খাবারের বদলে আজ তাদের পাতে ছিল বিশেষ আয়োজন। আর এই আয়োজনের মধ্যমণি ছিলেন এলাকার পরিচিত মুখ ও মানবিক সমাজসেবক মোহাম্মদ মিলন মিয়া। গত শুক্রবারের মতো আজ ২৫ জুলাই, শনিবারও তিনি হাজির হয়েছিলেন এতিমখানার ছোট্ট শিশু ও শিক্ষার্থীদের মাঝে। তবে তিনি শুধু খাবার পাঠিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং নিজে বসে শিশুদের সাথে একসাথে দুপুরের খাবার খেয়েছেন। মিলন মিয়ার এই আন্তরিকতা শিশুদের মনে ১০০% তৃপ্তি আর মুখে এক চিলতে অমূল্য হাসি ফুটিয়ে তুলেছে।
ঝিনাইদহ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত বেড়াশুলা এতিমখানাটি মূলত সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় শিশুদের আশ্রয়স্থল। এখানে থাকা শিশুদের প্রায় ৯০% এরও বেশি তাদের মা কিংবা বাবা অথবা উভয়কেই হারিয়েছে। এই নিঃস্ব শিশুদের জন্য মিলন মিয়া যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সত্যিই বিরল। গত শুক্রবার তিনি প্রথম এই আয়োজন শুরু করেছিলেন। সেই দিনের সফলতার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে শনিবারও তিনি এই শিশুদের সাথে সময় কাটাবেন। তার মতে, এতিম শিশুদের মাথায় হাত রাখা এবং তাদের সাথে সময় কাটানো সওয়াবের কাজ। তিনি যখন বড় একটি থালায় করে শিশুদের সাথে খেতে বসলেন, তখন চারপাশের পরিবেশটা এক আবেগঘন মায়ার চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মোহাম্মদ মিলন মিয়া বলেন, “আমি খুব বড় কোনো ধনী মানুষ নই, কিন্তু আমার হৃদয়টা এই শিশুদের জন্য সবসময় কাঁদে। আমাদের সমাজে অনেকে আছেন যাদের ব্যাংকে লক্ষ লক্ষ ডলার ($) পড়ে থাকে, কিন্তু পাশের বাড়ির ক্ষুধার্ত শিশুটির খবর তারা রাখেন না। আমি চাই আমার এই সামান্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের অন্তত ১০% বিত্তবান মানুষ যদি অনুপ্রাণিত হয়, তবেই আমার সার্থকতা।” তিনি আরও বলেন যে, মহান আল্লাহ তাকে যতটুকু সামর্থ্য দিয়েছেন, তার অন্তত ২০% থেকে ৩০% তিনি সবসময় অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করেন। আজকের এই আয়োজনে শিশুদের তৃপ্তিভরে খেতে দেখে তার মনে যে প্রশান্তি এসেছে, তা কোনো টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।
এই প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে মিলন মিয়া একা ছিলেন না। তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন বেড়াশুলা এতিমখানার শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষার্থী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। খাবারের মেন্যু খুব জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও তাতে ছিল মমতার ছোঁয়া। এতিমখানার একজন শিক্ষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমাদের এখানে অনেকে দান করেন, টাকা দিয়ে যান। কিন্তু মিলন মিয়ার মতো এভাবে এসে শিশুদের পাশে বসে খাওয়ার মানুষ খুব কম দেখা যায়। তিনি আমাদের এতিমখানায় নিয়মিত আসেন এবং শিশুদের খোঁজখবর নেন। গত দুই দিনে তিনি যেভাবে শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, তাতে আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।” খাবার শেষে মাদ্রাসার সকল ছাত্র ও শিক্ষক মিলে মিলন মিয়ার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা মিলন মিয়ার এই কাজকে যুবসমাজের জন্য একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। উপস্থিত একজন স্থানীয় মুরুব্বি বলেন, “বর্তমানে আমাদের এলাকার অন্তত ৫০% যুবক মোবাইলে গেম খেলে বা আড্ডাবাজি করে সময় নষ্ট করে। তারা যদি মিলন মিয়ার মতো এমন সমাজসেবায় এগিয়ে আসত, তবে আমাদের সমাজটা আরও সুন্দর হতো।” মিলন মিয়া প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের সেবা করার জন্য কোটিপতি হওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু একটা সুন্দর মনের প্রয়োজন। তিনি নিজ এলাকার গরিব ও অসহায় মানুষের বিপদে-আপদে সবসময় যেভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়ান, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তার এই মানবিক উদ্যোগ এলাকার বিত্তবানদের ওপর একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে এতিমখানার সংখ্যা অনেক হলেও সরকারি ও বেসরকারি অনুদান সবসময় সব জায়গায় পৌঁছায় না। বিশেষ করে মফস্বলের এতিমখানাগুলোতে বছরের অধিকাংশ সময় ডাল-ভাতেই জীবন কাটে শিশুদের। এমন পরিস্থিতিতে মিলন মিয়ার মতো শৌখিন সমাজসেবকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলো শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে যেমন সাহায্য করে, তেমনি তাদের মানসিকভাবেও চাঙ্গা রাখে। মিলন মিয়া আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামীতেও তিনি এতিম ও অসহায় শিশুদের কল্যাণে তার এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। তিনি মনে করেন, সমাজের অবহেলিত এই শিশুদের যদি আমরা সঠিক ভালোবাসা ও শিক্ষা দিতে পারি, তবে তারাও একদিন দেশের সম্পদে পরিণত হবে।
সবশেষে বলা যায়, মিলন মিয়ার এই মহতী উদ্যোগ ঝিনাইদহ ছাড়িয়ে সারা দেশের মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সেটি হলো—মানুষ মানুষের জন্য। একটি এতিমখানার ১০০ জন শিশুর পেটে ভাত দেওয়া হয়তো বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচন করবে না, কিন্তু ওই ১০০ জন শিশুর কাছে পৃথিবীটা অনেক বেশি সুন্দর হয়ে উঠবে। মিলন মিয়া সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভালোবাসা ভাগ করে নিলে আনন্দ শতগুণ বেড়ে যায়। তিনি আগামী দিনেও সমাজের অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার জন্য সবার কাছে দোয়া ও আন্তরিক সহযোগিতা চেয়েছেন। তার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বেড়াশুলা এতিমখানার শিশুদের স্মৃতিতে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
















