শৈলকুপায় গভীর রাতে পুলিশের অ্যাকশন: সাজাপ্রাপ্ত দুই মাদকসেবী এখন কারাগারে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা এলাকায় মাদক দমনে পুলিশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাত তখন আড়াইটা (০২:৩০)। সাধারণ মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখন শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল অন্ধকার ঠেলে অভিযানে নামে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে পুলিশ হাতেনাতে দুই মাদকসেবীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার সরাসরি দিকনির্দেশনায় এই অভিযানটি সফল হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত দুই যুবকই দীর্ঘকাল ধরে মাদক সেবনের মাধ্যমে এলাকায় সামাজিক পরিবেশ নষ্ট করছিল।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজনের নাম মোঃ আল মামুন, যার বয়স মাত্র ২২ বছর। তিনি শৈলকুপার সাধুহাটি গ্রামের মোঃ সৌরভ হোসেনের ছেলে। বয়সে তরুণ হলেও মামুনের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের একাধিক অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের। অন্যজন হলেন বকশিপুর গ্রামের মোঃ লিয়াকত বিশ্বাসের ছেলে মোঃ কাজল হোসেন বিশ্বাস (৩৩)। পুলিশ জানিয়েছে, এরা দুজনেই সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে নেশার মরণজালে আটকে পড়েছিলেন। মধ্যরাতে যখন তারা মাদক সেবন করছিলেন, ঠিক তখনই পুলিশ তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। পালানোর কোনো সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। শৈলকুপা পুলিশের এই সময়োচিত পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার ১০০% সচেতন মানুষ।

পরদিন সকালে পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে। আদালত সব নথিপত্র এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে দ্রুত রায় প্রদান করেন। রায়ে বিজ্ঞ আদালত আসামী মোঃ আল মামুনকে ০৩ (তিন) মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। এর পাশাপাশি তাকে ১০০০ (এক হাজার) টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যদি মামুন এই ১০০০ টাকা জরিমানা দিতে ব্যর্থ হন, তবে তাকে অতিরিক্ত আরও ১০ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, আসামী মোঃ কাজল হোসেন বিশ্বাসকে ০২ (দুই) মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং একই হারে অর্থাৎ ১০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কাজলও জরিমানা অনাদায়ে আরও ১০ দিনের অতিরিক্ত জেল খাটবেন। আদালতের এই রায়ের পর পুলিশ তাদের সরাসরি জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়।

মাদকের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈলকুপার মতো এলাকাগুলোতে মাদকসেবীর সংখ্যা যদি ১% হারেও বাড়ে, তবে সেটি পুরো উপজেলার নিরাপত্তার জন্য হুমকি। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানে কোনো মাদকসেবীকেই তারা ছাড় দেবেন না। বিশেষ করে মধ্যরাতে বা নির্জন স্থানে যারা নেশার আসর বসায়, তাদের তালিকা তৈরি করছে পুলিশ। এই অভিযানের ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ অফিসাররা বলছেন, একজন মাদকসেবী মাদক কেনার জন্য প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ করে, যা মূলত অবৈধ পথে সংগৃহীত হয়। এই টাকার উৎস খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায় তারা চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা এই অভিযানের বিষয়ে বলেন, “আমরা মাদকের বিরুদ্ধে ০% (শূন্য শতাংশ) সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছি। আমাদের কাছে মাদক ব্যবসায়ী আর মাদকসেবীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, কারণ মাদকসেবীরাই বাজার তৈরি করে। আমরা চাই শৈলকুপার প্রতিটি ঘর মাদক মুক্ত হোক।” তিনি আরও জানান যে, এই ধরণের অভিযান ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে। শৈলকুপা থানার অফিসার ফোর্স এখন ২৪ ঘণ্টাই টহল দিচ্ছে যাতে কোনো অপরাধী পার না পায়। পুলিশের লক্ষ্য হলো এলাকার অপরাধ প্রবণতা ১০০% কমিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

মাদকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শত শত পরিবার। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ তাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর চড়াও হয়। শৈলকুপার সাধুহাটি এবং বকশিপুর এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, মামুন ও কাজলের মতো মাদকসেবীদের সাজা হওয়ায় এলাকায় অন্তত কিছুদিন শান্তি বজায় থাকবে। তারা মনে করেন, মাদকবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে যুব সমাজকে বাঁচানো সম্ভব নয়। পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপ এবং আদালতের তাৎক্ষণিক সাজা প্রদানের বিষয়টি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অনেকেই মনে করছেন, ১০০০ টাকার জরিমানা হয়তো বড় কিছু নয়, কিন্তু জেলের ভাত খাওয়া এই যুবকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।

বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক বিরোধী বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশি তথ্যে জানা যায়, মাদকসেবীদের কারণে পাড়া-মহল্লায় ইভটিজিং এবং ছোটখাটো বিবাদের ঘটনা বেড়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে শৈলকুপা থানা পুলিশ নিয়মিতভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, সচেতনতা আর আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল মাদক থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আসামী মামুন ও কাজলকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার অর্থ হলো তাদের দিয়ে এখন জেলখানায় কঠোর পরিশ্রম করানো হবে, যা তাদের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কাজ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, শৈলকুপা থানা পুলিশের এই সাহসী অভিযান এলাকার সাধারণ মানুষের মনে পুলিশি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২৫ জুলাইয়ের সেই গভীর রাতের অভিযান প্রমাণ করে যে, অপরাধ করে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। মাদক সেবন হোক বা ব্যবসা, অপরাধীদের ডেরায় পুলিশ হানা দেবেই। পুলিশ আশা করছে, এলাকার মানুষ তাদের ১০০% সহযোগিতা করবে এবং মাদকের কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই থানাকে অবহিত করবে। তবেই শৈলকুপা হবে একটি অপরাধমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য আদর্শ জনপদ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ