লন্ডনের রাস্তাগুলো তখন বড়দিনের আলোয় সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক এমন সময়ে শহরের এক অতি বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো ২৯ বছরের এক তরুণকে, যার ধমনীতে বইছিল রাজবংশের রক্ত। তিনি আর কেউ নন, সৌদি আরবের রাজপরিবারের সদস্য আবদুল্লাহ বিন ফাহাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ বিন জালাউই আল সৌদ। গত বছরের ২৫ নভেম্বর পশ্চিম লন্ডনের কেনসিংটন এলাকায় অবস্থিত নামী মারিয়ট হোটেলের বাথরুম থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সম্প্রতি এই মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করেছে লন্ডন আদালত, যেখানে উঠে এসেছে মাদকের এক ভয়াবহ মরণ নেশার গল্প। রাজকীয় সম্পদ আর আভিজাত্য যে মানুষকে শান্তি দিতে পারে না, এই ঘটনা যেন তারই এক জলজ্যন্ত প্রমাণ।
আদালতের প্রকাশ করা ময়নাতদন্ত ও বিষক্রিয়া পরীক্ষার প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা শুনে যে কেউ চমকে উঠবেন। মৃত্যুর সময় প্রিন্স আবদুল্লাহর শরীরে অ্যালকোহলের মাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০০% বা তিন গুণ বেশি। শুধু মদ খেয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি, তাঁর রক্তে পাওয়া গেছে বিষাক্ত ড্রাগের এক ভয়ংকর মিশ্রণ। আধুনিক বিশ্বে পার্টি ড্রাগ হিসেবে পরিচিত ক্ষতিকর ‘জিএইচবি’ (গামা-হাইড্রোক্সিবুটাইরেট)-এর পাশাপাশি তাঁর শরীরে ক্যানাবিস বা গাঁজা, জ্যানাক্স এবং একাধিক উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এতগুলো ড্রাগ এবং অ্যালকোহল একসাথে শরীরে প্রবেশ করলে হৃদযন্ত্র বা ফুসফুস যেকোনো সময় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এই ভয়াবহ ‘ককটেল’ ড্রাগই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
টাকার পাহাড় দিয়েও যে মানসিক স্বস্তি কেনা যায় না, প্রিন্স আবদুল্লাহর জীবন তার বড় উদাহরণ। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মদ্যপান এবং জ্যানাক্স নামক ওষুধের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। এই মরণ নেশা থেকে মুক্তি পেতে তিনি চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘প্রায়োরি ক্লিনিকে’ ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে কেবল এক সপ্তাহের চিকিৎসার খরচ ছিল প্রায় ৩৫,০০০ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫২ লক্ষ টাকার সমান। অর্থাৎ মাসে প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করেও তিনি নিজেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পারেননি। এরপর তিনি লিভারপুলের কাছাকাছি ‘রেইনফোর্ড হল’ নামে আরেকটি নামী রিহ্যাব সেন্টারেও কিছুদিন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কোনো চিকিৎসাই তাঁকে নেশার জগৎ থেকে পুরোপুরি বের করে আনতে পারেনি।
হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ও কর্তৃপক্ষের বয়ান থেকে জানা যায়, প্রিন্স আবদুল্লাহ ১৯ নভেম্বর এক সপ্তাহের জন্য মারিয়ট হোটেলের পঞ্চম তলায় একটি রুম বুক করেছিলেন। তিনি সেখানে বেশ চুপচাপই থাকতেন এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে পছন্দ করতেন। মৃত্যুর আগের দিন সন্ধ্যায় তাঁকে শেষবারের মতো হোটেলের বাইরে ধূমপান করতে দেখা যায়। পরদিন যখন বেশ অনেকক্ষণ তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন হোটেলের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়ম অনুযায়ী ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঘরে ঢোকেন। তিনি দেখতে পান, বাথরুমটি ভেতর থেকে তালাবন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পর সাড়া না পেয়ে বিকল্প উপায়ে দরজা খোলা হলে দেখা যায়, জামাকাপড় পরা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন প্রিন্স। প্যারামেডিক দল দ্রুত এসে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়নি, চিকিৎসকেরা তাঁকে তখনই মৃত ঘোষণা করেন।
সহকারী করোনার জিন হারকিন এই ঘটনার তদন্ত শেষ করে জানিয়েছেন যে, এখানে কোনো রহস্য নেই। সিসিটিভি ফুটেজে অন্য কোনো ব্যক্তিকে তাঁর রুমে ঢুকতে দেখা যায়নি। রুমের ভেতরেও কোনো ধস্তাধস্তি বা অস্বাভাবিকতার চিহ্ন ছিল না। এমনকি মৃত্যুর আগে তিনি কোনো সুইসাইড নোট বা বিদায় বার্তাও লিখে যাননি। ফলে এটি যে কোনো পরিকল্পিত হত্যা বা আত্মহত্যা নয়, তা ১০০% নিশ্চিত হওয়া গেছে। মূলত অতিরিক্ত মাত্রায় ড্রাগ এবং অ্যালকোহলের বিষক্রিয়া সহ্য করতে না পেরে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল। এটি ছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা মাত্র, যা অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে ঘটেছে। আদালতের ভাষায়, শরীরের ভেতর ড্রাগের উচ্চমাত্রা বা ‘ওভারডোজ’ হওয়ার কারণেই রাজপুত্রের মৃত্যু হয়েছে।
আবদুল্লাহ বিন ফাহাদ সৌদি আরবের বর্তমান বাদশাহ সালমানের এক প্রপিতামহের বংশধর ছিলেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যু সৌদি রাজপরিবারের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। পশ্চিম লন্ডনের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের আড়ালে যে একাকিত্ব আর বিষণ্ণতা লুকিয়ে ছিল, তা বাইরে থেকে কেউ টেরও পায়নি। সৌদি আরবে যেখানে অ্যালকোহল ও মাদক পুরোপুরি নিষিদ্ধ, সেখানে রাজবংশের একজন সদস্যের লন্ডনের বুকে এমন মৃত্যু নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। অগাধ সম্পদ থাকার পরেও রাজকীয় এই সদস্য ড্রাগমুক্ত জীবনের জন্য লড়াই করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে তিনি হেরে গেলেন। তাঁর এই পরিণতি যেন বিশ্বের সকল বিত্তশালী তরুণদের জন্য এক করুণ শিক্ষা হয়ে রইল।
লন্ডনের এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আবারও মাদকের ভয়াবহ পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১০/১০ ভাগ সুযোগ-সুবিধা পেয়েও যদি একজন রাজপুত্রকে এভাবে জীবন দিতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। মাদক কেবল শরীর ধ্বংস করে না, এটি তিলে তিলে একটি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তা সে সাধারণ মানুষ হোক বা কোনো রাজপরিবারের সদস্য। ব্রিটিশ আদালত এই মামলাটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিলেও প্রিন্স আবদুল্লাহর এই করুণ বিদায় বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে এক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মাদক কখনো জীবনের সমাধান হতে পারে না, বরং এটিই জীবনের অকাল সমাপ্তি টেনে আনে।
















