কমলগঞ্জে চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম: ৫০০ টাকা মজুরি ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার চাম্পারায় চা বাগান এলাকা আজ এক ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল। সবুজ চায়ের পাতার মাঝে সাদা কামিজ আর মলিন শাড়ির ভিড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল হাজারো শ্রমিকের বাঁচার দাবি। আজ ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার সকালে চাম্পারায় চা বাগানের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়েছিলেন শত শত চা শ্রমিক, ছাত্র ও যুবকরা। তাঁদের মূল দাবি একটিই মানবিক জীবন যাপনের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নিশ্চিত করা। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে নামমাত্র মজুরিতে যে জীবন চলছে না, সেই ক্ষোভের আগুন আজ রাজপথে ঝরে পড়ল। সাধারণ চা শ্রমিক ও ছাত্র যুবসমাজের ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভ সমাবেশে শ্রমিকরা তাঁদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন।

সমাবেশে বক্তারা অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় তাঁদের দৈনন্দিন কষ্টের কথা বর্ণনা করেন। নারী শ্রমিক দুর্গামণি অলমিক বলেন, “বাজারে চাল-ডাল থেকে শুরু করে কাঁচামরিচের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে বর্তমান মজুরি দিয়ে দিন পার করা এখন ১০/১০ ভাগ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।” উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে জাতীয় সংসদে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার একটি প্রস্তাব উঠেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এই বিষয়টি চা শ্রমিকদের মনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, নীতিনির্ধারক পর্যায়ে তাঁদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। অথচ বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% থেকে ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

বর্তমানে একজন চা শ্রমিক যে মজুরি পান, তা আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসেবে প্রায় ১.৫ ডলারের ($) নিচে। যেখানে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে বাংলাদেশের এই চা শ্রমিকরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। সন্তানদের পড়ালেখা আর ওষুধের খরচ মেটাতে গিয়ে প্রায় ৭০% চা শ্রমিক পরিবার এখন ঋণের জালে আটকে আছে। তিলকপুর চা বাগানের জনক লাল দেশওয়ার এবং শমসেরনগর চা বাগানের গোপাল গোয়ালা সমাবেশে বলেন, “আমরা কি কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেই জন্মেছি? আমাদের সন্তানদের কি ভালো স্কুলে পড়ার বা ভালো খাবার খাওয়ার কোনো অধিকার নেই?” তাঁদের মতে, ৫০০ টাকা মজুরি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি টিকে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন।

মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি চা শ্রমিকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন। বক্তারা অভিযোগ করেন যে, শ্রম অধিদপ্তর সরাসরি এই নির্বাচনে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করছে, যা পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। শ্রমিকরা চান একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেখানে তাঁরা নিজেদের যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নিতে পারবেন। সমাবেশে চা যুব সংঘের সানী দাস এবং শংকর বুন্যার্জি দাবি করেন, শ্রম অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপের কারণে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ১০০% ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে ইউনিয়ন পরিচালনা করতে চান, যাতে মালিকপক্ষের সাথে ন্যায্য মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সঠিক দরকষাকষি করা যায়।

চা বাগানে বসবাসকারী মানুষদের জীবনযাত্রা দেখলে যে কেউ অবাক হবেন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সেখানে আজও ৫% এর নিচে। নারী নেত্রী গীতা রানী কানু বলেন, পরিবারের পুষ্টির কথা তো দূরে থাক, দুই বেলা পেট ভরে ভাতের যোগান দিতেই আমাদের হিমশিম খেতে হয়। সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দেওয়া তো এখন আকাশকুসুম কল্পনা। সমাবেশে অংশ নেওয়া ছাত্ররা বলেন, তাদের বাবা-মায়েরা জীবনভর বাগানে শ্রম দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন কেবল অবহেলা। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি দ্রুত চা শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেওয়া না হয়, তবে আগামীতে সারা জেলার সব বাগানে একযোগে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

কমলগঞ্জের এই সমাবেশ কেবল একটি প্রতিবাদ ছিল না, এটি ছিল হাজারো অবহেলিত মানুষের আর্তনাদ। চা শ্রমিকরা মনে করেন, সরকার যদি চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন করা সবার আগে জরুরি। মজুরি ৫০০ টাকা করা এবং দ্রুত ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজন করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। পুরো মৌলভীবাজার জেলার চা শ্রমিকরা এখন সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের খবর চাম্পারায় বাগান ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী বাগানগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরিশেষে, বক্তারা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানান যেন দ্রব্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে মজুরি বাড়ানো হয়। তাঁরা বলেন, চা পাতা রপ্তানি করে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও সেই আয়ের কত শতাংশ শ্রমিকের পেটে যায়, তা দেখার কেউ নেই। আজ শুক্রবারের এই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট—চা শ্রমিকরা আর মুখ বুজে সব সহ্য করবেন না। তাঁরা তাঁদের অধিকার আদায়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মালিকপক্ষ এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায্য দাবির প্রতি কতটা সদয় হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ