ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামে এক সফল মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশ। এই অভিযানে ৩১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মোঃ দুলভ মোল্লা (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। আজ ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ রোজ বুধবার দুপুরের দিকে তাকে চন্ডিপুর গ্রামের দাসপাড়াস্থ হাইওয়ে রোডের পাশের একটি দোকানের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটক দুলভ মোল্লা ওই গ্রামেরই মোঃ জাহাঙ্গীর মোল্লার ছেলে। পুলিশের এই ঝটিকা অভিযানে মাদক কারবারিদের মধ্যে যেমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে ফিরেছে স্বস্তি।
ঘটনার বিস্তারিত জানা যায় পুলিশের বিশেষ টহল দল যখন এলাকা পরিদর্শনে ছিল, তখন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে চন্ডিপুর দাসপাড়া এলাকায় মাদকের একটি লেনদেন হতে যাচ্ছে। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ সদস্যরা সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্মে চন্ডিপুর হাইওয়ে রোডের পাশে অবস্থান নেন। জনৈক বিপ্লবের ইলেকট্রিক দোকানের সামনে দুলভ মোল্লার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ তাকে চ্যালেঞ্জ করে। প্রথমে সে পালানোর চেষ্টা করলেও পুলিশ সদস্যরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। পরে তার দেহ তল্লাশি করে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ৩১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, দুলভ মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। সে মূলত তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে এই ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। স্থানীয় একজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, চন্ডিপুর দাসপাড়া এলাকায় ইদানীং মাদকের প্রভাব ২০% বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর হাইওয়ে রোডের পাশে বিভিন্ন ছোট দোকানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। পুলিশের এই গ্রেপ্তারের ফলে এলাকার মাদক সিন্ডিকেট কিছুটা হলেও দুর্বল হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। অনেক দিন ধরেই এলাকার সচেতন মহল এই মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করে আসছিল, কিন্তু প্রভাবশালী মহলের ভয়ে কেউ সরাসরি মুখ খুলতে সাহস পেত না।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধারকৃত ইয়াবার বাজার মূল্য অনেক। বর্তমান খোলা বাজারে প্রতিটি ইয়াবা ট্যাবলেটের দাম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সেই হিসেবে আটককৃত ইয়াবার মূল্য প্রায় ১০,০০০ টাকার উপরে। আন্তর্জাতিক বাজারের হিসেবে এটি প্রায় ১০০ ডলারের ($) কাছাকাছি মূল্যের মাদক। পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আটক দুলভ মোল্লা পেশাদার মাদক কারবারি কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে শৈলকূপা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ আরও জানায় যে, দুলভ মোল্লার সাথে আর কারা এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের নামও বের করার চেষ্টা চলছে।
শৈলকূপা থানা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই প্রতিনিধিকে বলেন, “আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। চন্ডিপুর হোক বা অন্য কোনো গ্রাম, যেখানেই মাদকের খবর পাব সেখানেই অভিযান চলবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ঝিনাইদহ জেলায় গত এক মাসে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা পূর্বের মাসের তুলনায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মানে হলো পুলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর। পুলিশের এই অভিযানে সাধারণ মানুষ বেশ খুশি। তারা চান শুধু দুলভ নয়, বরং যারা বড় বড় চালান নিয়ে আসে তাদেরও যেন আইনের আওতায় আনা হয়।
মাদকের নেশা এখন শুধু শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন গ্রামের মেঠো পথ ছাড়িয়ে হাইওয়ে রোডের পাশের চায়ের দোকানেও পৌঁছে গেছে। চন্ডিপুর গ্রামের দাসপাড়া এলাকাটি হাইওয়ের পাশে হওয়ায় অপরাধীরা খুব সহজেই এখান দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। বিপ্লবের ইলেকট্রিক দোকানের সামনে দুলভকে ধরার বিষয়টি এলাকার মানুষের কাছে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেরা যাতে এই মরণ নেশার শিকার না হয়, সেজন্য অভিভাবকরা এখন অনেক বেশি চিন্তিত। এলাকার শিক্ষকরা বলছেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে শুধু গ্রেপ্তার করে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়।
দুলভ মোল্লার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা তেমন কিছু বলতে রাজি হননি। তবে স্থানীয়রা বলছে, জাহাঙ্গীর মোল্লার ছেলে দুলভ এর আগেও নানা ছোটখাটো অপরাধে জড়িত ছিল। এবার সরাসরি ইয়াবাসহ ধরা পড়ায় তার শাস্তির দাবি তুলছেন প্রতিবেশীরা। পুলিশের নথিতে দেখা গেছে, এই এলাকায় ইদানীং মাদক কেনাবেচার হার প্রায় ২৫% বেড়েছে যা আইন-শৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বেকার যুবকরা অল্প সময়ে বেশি টাকা আয়ের আশায় এই পথে পা বাড়াচ্ছে। অথচ তারা বুঝতে পারছে না যে এতে তাদের জীবন ও সমাজ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অবশেষে পুলিশ দুলভ মোল্লাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এলাকাবাসী মনে করছেন, এই গ্রেপ্তারের ফলে সাময়িকভাবে হলেও এলাকায় শান্তি বজায় থাকবে। তবে হাইওয়ে রোডের নিরাপত্তা এবং নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। মাদক নির্মূলে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আজকের এই সফল অভিযান শৈলকূপার মাদকবিরোধী যুদ্ধে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আশা করছে, ২৪ জুলাইয়ের এই অভিযান যেন ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং শৈলকূপা উপজেলাটি একদিন পুরোপুরি মাদকমুক্ত হয়।
















