সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আগামী ২৬ জুলাই রোববার তাঁর ফেরার কথা থাকলেও হঠাৎ করেই সেই সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামীকাল শুক্রবার দুপুরেই তিনি ঢাকায় অবতরণ করবেন। সংসদ সচিবালয় সূত্রে এই খবরের সত্যতা ১০০% নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্পিকারের এই আকস্মিক ফেরার খবরে এখন রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে সচিবালয়ের অন্দরমহল পর্যন্ত সর্বত্রই একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তবে কি সত্যিই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগিরই তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন?
গত কয়েক দিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই গুঞ্জনটি বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যে কোনো মুহূর্তে তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিতে পারেন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগ করতে চান, তবে তাঁকে সেই পদত্যাগপত্র সরাসরি স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হয়। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অবস্থান করছেন। তিনি গত ১৯ জুলাই ব্যাংকক গিয়েছিলেন এবং সেখানে অন্তত এক সপ্তাহ থাকার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের আলোচনার মধ্যেই স্পিকারের সফরের সময়সূচি প্রায় ৪৮ ঘণ্টা এগিয়ে আনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করার কোনো আইনি পথ খোলা নেই বললেই চলে, আর সম্ভবত এই আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতেই তিনি তড়িঘড়ি করে ফিরছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যদি রাষ্ট্রপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হয়, কিংবা তিনি অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, তবে স্পিকারই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকারই দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে কাজ করবেন। এছাড়া সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার পর যদি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন, তবে স্পিকারকেই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির গুরুদায়িত্ব পালন করতে হতে পারে।
সংসদ সচিবালয় ও বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আগামীকাল শুক্রবার থাই এয়ারওয়েজের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে ঢাকা পৌঁছাবেন। ফ্লাইটটি দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করার কথা রয়েছে। বিএনপি সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পিকারের উপস্থিতি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের জন্য এখন খুবই জরুরি। গত ৫ দিন ধরে তিনি ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো এবং তিনি দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের জন্য সম্পূর্ণ ফিট বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
এদিকে, আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা বারবার প্রশ্ন করলে তিনি বেশ রহস্যজনক এক উত্তর দেন। তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে স্মিত হেসে বলেন, ‘আপনারা অস্থির হবেন না, আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ছোট কথাটি যেন আগুনের উত্তাপে আরও ঘি ঢেলে দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, শুক্রবার স্পিকার ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিকেলের দিকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে। অর্থাৎ, শুক্রবারের সেই দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটের ওপরই এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ।
রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এই একই আলোচনা। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের থাকা না থাকা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। যদি তিনি সত্যি পদত্যাগ করেন, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি হবে একটি বড় ধরনের সাংবিধানিক মোড়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে এই ধরনের বড় পরিবর্তন দেশের প্রশাসন ও রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় দেখার বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্পিকারের উপস্থিতিতে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে তার একটি স্বচ্ছ আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা থাকবে, যা ভবিষ্যতে কোনো আইনি প্রশ্ন ওঠার সুযোগ রাখবে না।
উল্লেখ্য যে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ যখন ১৯ জুলাই ব্যাংকক গিয়েছিলেন, তখন সেটি ছিল তাঁর নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার একটি অংশ। সাধারণত ব্যাংককে এ ধরনের চেকআপের জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন সময় প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সাধারণ মানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও আলটিমেটাম বিষয়টিকে অনেক দ্রুততর করেছে। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন অতিরিক্ত সময় কাজ করছেন এবং শুক্রবার ছুটির দিনেও অনেক দপ্তর খোলা রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্পিকারের দেশে ফেরার সাথে সাথেই যেন প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখা যায়, সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।
পরিশেষে বলা যায়, আগামীকাল শুক্রবারের দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বিশেষ মুহূর্ত হয়ে থাকতে পারে। স্পিকার যখন বিমানবন্দরে পা রাখবেন, তখন হয়তো অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিলতে শুরু করবে। ৯০ দিনের সেই সাংবিধানিক সময়সীমা, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কিংবা স্পিকারের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ—সবই এখন সময়ের হাতে। তবে সাধারণ মানুষের চাওয়া হলো একটি শান্তিপূর্ণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন এই জাতীয় সংকটের সমাধান হয়। আপাতত পুরো দেশবাসী এখন ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছেন এবং স্পিকারের ফেরার প্রহর গুনছেন।
















