হরিণাকুণ্ডুতে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন: ফুটবল জ্বরে কাঁপছে পুরো উপজেলা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় আজ এক উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল ‘জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’। উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্মিলিত আয়োজনে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের উপজেলা পর্যায়ের খেলাগুলো ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই ২০২৬) দুপুরে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী প্রিয়ানাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে বেলুন উড়িয়ে ও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই টুর্নামেন্টের শুভ উদ্বোধন করেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাঠের চারদিকে হাজার হাজার দর্শকের হর্ষধ্বনি আর করতালিতে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রদীপ্ত রায় দীপন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “খেলাধুলা কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি তরুণ সমাজকে মাদক ও বিপথগামিতা থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আমরা চাই আমাদের এই মাঠ থেকে নতুন নতুন ফুটবলার তৈরি হয়ে জাতীয় পর্যায়ে হরিণাকুণ্ডুর নাম উজ্জ্বল করুক।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে পুরো উপজেলায় ১০০% উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারের টুর্নামেন্টে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সেরা দলগুলো অংশগ্রহণ করছে, যা গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সংস্কৃতিকে আবারও চাঙ্গা করে তুলবে।

উদ্বোধনী এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলা বিএনপির সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মো. আবুল হাসান মাস্টার। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দজাদী মাহবুবা মঞ্জুর মৌনা। অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তাইজাল হোসেন এবং উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন। এছাড়াও পৌর বিএনপির সভাপতি মো. জিন্নাতুল হক খাঁন উপস্থিত থেকে মাঠের খেলোয়াড়দের উৎসাহ প্রদান করেন। অতিথিরা বলেন, ফুটবল আমাদের দেশের মানুষের হৃদয়ের খেলা, আর এই টুর্নামেন্ট স্থানীয় প্রতিভা অন্বেষণে বড় ভূমিকা রাখবে।

মাঠের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার জন্য হরিণাকুণ্ডু থানার সেকেন্ড অফিসার শ্যামা প্রসাদের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ টিম নিয়োজিত ছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রভাষক আনিচুর রহমান এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল ওহেদ জোয়ার্দার। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হরিণাকুণ্ডু পৌর ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসকের বিশেষ সহকারী মো. তারেক আল মামুন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ এবং বিপুল সংখ্যক ক্রীড়ামোদী দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো মাঠ ছিল জনসমুদ্রের মতো।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের টুর্নামেন্টে মোট ১০টি দল অংশগ্রহণ করছে। টুর্নামেন্টের মোট বাজেট ধরা হয়েছে কয়েক লক্ষ টাকা এবং বিজয়ীদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় প্রাইজমানি ও ট্রফি। মাঠের দর্শকদের তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনী ম্যাচেই মাঠে প্রায় ৫,০০০ এর বেশি দর্শকের সমাগম ঘটে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই ফুটবল টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারে বেচাকেনা ২০% থেকে ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ দূর-দূরান্ত থেকে ফুটবল ভক্তরা প্রিয় দলের খেলা দেখতে হরিণাকুণ্ডু সদরে আসছেন। প্রিয়ানাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠটিকে টুর্নামেন্ট উপলক্ষে বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে এবং মাঠের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০০ শতাংশ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের খেলোয়াড়দের সাথে অতিথিরা পরিচিত হন এবং কুশল বিনিময় করেন। এরপর রেফারির বাঁশিতে কিক-অফের মাধ্যমে খেলার শুরু হয়। খেলার প্রথমার্ধ থেকেই দুই দল আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে দর্শকদের রোমাঞ্চ উপহার দেয়। মাঠের চারদিকের গ্যালারিতে বসা দর্শকরা প্রতিটি গোলের সুযোগে চিৎকার করে উঠছিলেন। চশমা চোখে এক বৃদ্ধ দর্শক জানান, “বহু বছর পর হরিণাকুণ্ডুতে এমন জমকালো ফুটবল টুর্নামেন্ট দেখছি। এতে করে গ্রামের সাধারণ মানুষের বিনোদনের একটি বড় পথ তৈরি হয়েছে।” বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে এমন উন্মাদনা আগে খুব একটা দেখা যায়নি।

টুর্নামেন্টের ধারাভাষ্যকাররা জানান, প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে যাতে মাঠের বাইরে থাকা মানুষও খেলার আনন্দ উপভোগ করতে পারে। আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল মমিন বলেন, “আমরা শুধু ফুটবল খেলাচ্ছি না, আমরা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করছি। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, শৃঙ্খলা ও স্পোর্টসম্যানশিপ বজায় রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য।” টুর্নামেন্টের পরবর্তী খেলাগুলো সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন বিকেল ৪:০০ ঘটিকা থেকে শুরু হবে। স্থানীয় সংবাদকর্মীরাও এই আয়োজনকে সফল করতে মাঠ পর্যায় থেকে নিয়মিত সংবাদ প্রচার করছেন।

সবশেষে, এই টুর্নামেন্ট হরিণাকুণ্ডুর ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। মাদককে না বলে ফুটবলের সাথে থাকার যে আহ্বান প্রশাসন জানিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলাটিতে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। হরিণাকুণ্ডুবাসী এখন অপেক্ষায় আছেন টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য, যখন মাঠের লড়াই শেষে বিজয়ী দলের হাতে উঠবে ঝকঝকে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ট্রফি। এই আয়োজন সফল হলে প্রতি বছর এমন টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ