মো: সাখাওয়াত হোসেন মামুন, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল হলো পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সরকারি খাতায় এই হাসপাতালটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটিকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু ভবনের আয়তন বাড়লেও এই হাসপাতালের ভেতরে চলা চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় যেন আরও গভীরে যাচ্ছে। সাধারণ রোগীদের পকেট কাটতে এখানে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই দুর্নীতি বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দালালদের সাজা দেওয়া হলেও মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়নের চেয়ে পকেট ভারি করার প্রতিযোগিতাই এখন এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করে এবং সাধারণ রোগীদের সাথে কথা বলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বহির্বিভাগের একটি টিকিটের মূল্য মাত্র ৩ টাকা। কিন্তু পূর্বধলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই টিকিটের দাম নেওয়া হচ্ছে ৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি টিকিটে সরাসরি ৬৬% এর বেশি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সরকারি ছাপানো টিকিটের বদলে রোগীরা পাচ্ছেন ছোট এক টুকরো সাদা কাগজ, যার ওপর একটি সিল মেরে দেওয়া হচ্ছে। টিকিট কাউন্টারে বসা ক্লার্ক মো. আনোয়ার হোসেনের কাছে যখন সাংবাদিকরা জানতে চান যে কেন ৩ টাকার টিকিট ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তখন তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তার আমতা আমতা করা এবং রহস্যজনক আচরণই বলে দিচ্ছিল যে, এই টাকার কোনো হিসাব সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে না।
হাসপাতালের ভেতরে অভিযোগ রয়েছে যে, এই জালিয়াতি শুধু টিকিট ক্লার্ক আনোয়ার একাই করছেন না। এর পেছনে হাসপাতালের প্রধান ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ বিন এর সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে। এই দুইজনের সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানান, তারা বহুবার এই অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করেছেন এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মৌখিক অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। যদি প্রতিদিন ২ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হয়, তবে মাসে প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে, যার পুরোটাই চলে যাচ্ছে এই অসাধু চক্রের পকেটে।
চিকিৎসা নিতে আসা আগিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. বকুল মিয়া তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি অনেক কষ্ট করে নদী পাড় হয়ে হাসপাতালে এসেছি। কাউন্টারে ৩ টাকার টিকিট ৫ টাকা দিয়ে কিনলাম। কিন্তু ডাক্তার দেখার পর আমাকে জানানো হলো যে হাসপাতাল থেকে কোনো ঔষধ দেওয়া হবে না। তাহলে এই টাকা দিয়ে টিকিট কাটার মানে কী? আমাদের পকেটের টাকা দিয়ে তো এরা ব্যবসা করছে।” একই রকম অভিযোগ করেন ঘাগড়া ইউনিয়নের রানা মিয়া। তিনি জানান, বাড়ি থেকে হাসপাতালে আসতে তার যাতায়াত খরচ হয়েছে ৭০ টাকা। কিন্তু ডাক্তার তাকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকার ঔষধ দিয়েছেন। বাকি সব ঔষধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। রানা মিয়ার মতে, সরকারি হাসপাতালে এসে দালালের খপ্পরে পড়ার চেয়ে সরাসরি ফার্মেসিতে যাওয়াই এখন ভালো।
বকুল মিয়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “তারা আমাদের যে টিকিট দিচ্ছে তা আসলে কোনো টিকিটই না। এক টুকরো সাদা কাগজে হাসপাতালের একটি সিল মেরে ধরিয়ে দিচ্ছে। সেখানে হাসপাতালের নাম পর্যন্ত স্পষ্ট বোঝা যায় না। এটি একটি জঘন্যতম জালিয়াতি। সাদা কাগজে সিল মেরে টিকিট বানানো মানে হলো এই টাকার কোনো রেকর্ড তারা মেইনটেইন করছে না। বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগ—উভয় জায়গাতেই একই চিত্র। এভাবে যদি প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা মানুষের কাছ থেকে লুটে নেওয়া হয়, তবে পূর্বধলার সাধারণ মানুষের কপাল আর ফিরবে না।” সাধারণ মানুষের এই আক্ষেপ এখন পূর্বধলার অলিতে গলিতে চাউর হয়ে গেছে।
গত বুধবার নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাসুম মোস্তফা, নেত্রকোনা জেলার সিভিল সার্জন এবং পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। সাংবাদিকরা যখন তাদের সামনে এই সাদা কাগজের সিল মারা ৩ টাকার টিকিট ৫ টাকায় বিক্রির প্রমাণ তুলে ধরেন এবং রোগীরা যে ঔষধ পাচ্ছে না সেই বিষয়টি জানান, তখন তারা সকলেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাসুম মোস্তফা সরাসরি বলেন, “একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়।” তিনি সিভিল সার্জন ও ইউএনওকে দ্রুত তদন্ত করে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সিভিল সার্জনও আশ্বস্ত করেছেন যে, যদি আনোয়ার হোসেন এবং ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ বিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তাদের সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই দুর্নীতির খবর শুনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ এস এম শহীদুল্লাহ ইমরান এবং পূর্বধলা আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম। তারা পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা নিয়ে যারা দুর্নীতি করছে তারা সমাজের শত্রু। ৩ টাকার টিকিটে ৫ টাকা নেওয়ার মানে হলো দরিদ্র মানুষের পেটে লাথি মারা। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এই বিষয়ে তারা নিজস্ব সোর্স দিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং খুব শীঘ্রই দোষীদের হাসপাতাল থেকে বিতাড়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তারা সাফ জানিয়ে দেন।
সবশেষে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমি বিষয়টি কেবল জানলাম। ৩ টাকার টিকিট ৫ টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর সাদা কাগজে সিল মেরে টিকিট দেওয়াটাও নিয়মের বাইরে। আমি টিকিট ক্লার্ক এবং ক্যাশিয়ারের কাছে ব্যাখ্যা তলব করব। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে আশ্বাসের বাণীতে আর বিশ্বাস নেই সাধারণ মানুষের। পূর্বধলার লক্ষাধিক মানুষ এখন দেখতে চায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ। তারা চায় একটি দুর্নীতিমুক্ত হাসপাতাল, যেখানে ৩ টাকার টিকিট ৩ টাকাতেই পাওয়া যাবে এবং দরিদ্র রোগীরা অন্তত প্রয়োজনীয় ঔষধটুকু হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারবেন।
















