ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি সাধারণ গ্রাম দয়াপুর। এই গ্রামেরই এক যুবক জিল্লুর রহমান, যিনি উন্নত জীবনের আশায় দুই দুইবার বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তিনি পঙ্গু প্রায়, নিঃস্ব এবং সহায়-সম্বলহীন। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া এই যুবকের করুণ কাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরে আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি ঝিনাইদহ-৪ আসনের জননন্দিত সংসদ সদস্য আবু তালিব। গতকাল বুধবার বিকেলে তিনি ছুটে যান জিল্লুরের জরাজীর্ণ বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তিনি কেবল সমবেদনাই জানাননি, বরং ভুক্তভোগী জিল্লুরের চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি দেন। এমপির এই মানবিক উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
ঘটনার গভীরে গিয়ে জানা যায়, দয়াপুর গ্রামের বাহাদুর বিশ্বাসের ছেলে জিল্লুর রহমান অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। এই সরলতার সুযোগ নেয় পাতবিলা গ্রামের চিহ্নিত দালাল আরজ আলী। ২০২১ সালে জিল্লুর রহমান প্রায় ৪ লাখ টাকা (প্রায় $৩,৩৫০ ডলার সমমূল্য) ঋণ করে সৌদি আরবে যান। দালালের প্রতিশ্রুতি ছিল ভালো কোম্পানি এবং উচ্চ বেতন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর জিল্লুর দেখেন সব মিথ্যা। তাকে কোনো কোম্পানিতে কাজ না দিয়ে নামমাত্র বেতনে ‘সাপ্লাই ভিসায়’ কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা হয়। সেখানে ১০০% প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় খালি হাতেই তাকে দেশে ফিরতে হয়। সেই সময় নেওয়া ঋণের বোঝা তার কাঁধ থেকে নামেনি, বরং সুদের পাল্লা ভারি হতে থাকে।
কিন্তু দালালের প্রলোভন থামেনি। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে একই দালাল আরজ আলী আবারও জিল্লুরকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর স্বপ্ন দেখায়। এবার বলা হয় মালয়েশিয়ায় গেলে আগের সব লস কভার হয়ে যাবে। নিরুপায় জিল্লুর শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে এবং আবারও চড়া সুদে ধার করে প্রায় ৫ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দেন। মালয়েশিয়ায় পা রাখার সাথে সাথেই শুরু হয় নতুন এক অমানবিক অধ্যায়। তার পাসপোর্ট ও ভিসা কেড়ে নিয়ে তাকে একটি দুর্গম পাম বাগানে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে দাসের মতো খাটানো হতো। কয়েক মাস আগে সেই বাগানে কাজ করার সময় এক ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় জিল্লুর গুরুতর আহত হন। তার অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে, তাকে টানা ২৩ দিন হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) মৃত্যুর সাথে লড়তে হয়েছে। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তাকে কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই একপ্রকার শূন্য হাতে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বর্তমানে জিল্লুর রহমানের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দুর্ঘটনার কারণে তিনি আর আগের মতো ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। বাড়িতে তার স্ত্রী এবং ৩ জন ছোট সন্তান রয়েছে। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবারটি এখন অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। জিল্লুর রহমান কান্নজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি দালাল আরজ আলীর কাছে গিয়েছিলাম যেন সে আমার মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচের অন্তত ৫০% টাকা ফেরত দেয়। কিন্তু সে আমাকে উল্টো হুমকি দিচ্ছে। আমি এখন আমার ৩ সন্তান নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?” এই অমানবিক আচরণের প্রতিকার চেয়ে তিনি কালীগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং ঝিনাইদহ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সরদার মিল্টনের সহায়তায় ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’-এর আওতায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সাংসদ আবু তালিব যখন জিল্লুরের বাড়িতে পৌঁছান, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এমপি জিল্লুরের শরীরের ক্ষতগুলো দেখেন এবং তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি উপস্থিত গ্রামবাসীর সামনে ঘোষণা করেন যে, ঝিনাইদহে মানবপাচারকারী ও প্রতারক দালালদের কোনো ঠাঁই হবে না। তিনি বলেন, “বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে যারা মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। জিল্লুর একা নয়, আমি তার সাথে আছি। যারা তাকে পঙ্গু করেছে এবং তার টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।” তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জিল্লুরকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন যেন জিল্লুরের পরিবারকে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়।
এদিকে অভিযুক্ত দালাল আরজ আলীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জিল্লুর দেশে ফেরার পর এবং এমপি এই বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করার পর থেকেই আরজ আলী এলাকা ছেড়ে ঢাকায় গা ঢাকা দিয়েছেন। গ্রামবাসী জানান, আরজ আলীর মতো দালালরা গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে এবং বিদেশে পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না। তবে সংসদ সদস্যের কঠোর অবস্থানের পর সাধারণ মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার হয়েছে।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট সরদার মিল্টন বলেন, “জিল্লুরের সাথে যা হয়েছে তা স্রেফ প্রতারণা নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার আইনের লঙ্ঘন। আমরা ২০২৬ সালের নতুন আইন অনুযায়ী মামলার নথিপত্র গুছিয়ে ফেলেছি। আশা করছি আদালত থেকে আমরা ন্যায়বিচার পাব এবং জিল্লুরের অন্তত ৮০% ক্ষতিপূরণ আদায় করতে সক্ষম হব।” তিনি আরও জানান, দালালরা সাধারণত বিদেশে পাঠানোর সময় কোনো বৈধ কাগজপত্র দেয় না, যা আইনি লড়াইকে কঠিন করে তোলে। তবে জিল্লুরের কাছে থাকা কিছু ডিজিটাল এভিডেন্স এবং পেমেন্ট স্লিপ অপরাধীকে শনাক্ত করতে সহায়ক হবে।
পরিশেষে, সংসদ সদস্য আবু তালিবের এই সময়োচিত পদক্ষেপ ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। তিনি শুধু একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং একজন অভিভাবক হিসেবে জিল্লুরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের নজরদারি এবং জিরো টলারেন্স নীতি দালালদের দৌরাত্ম্য কতটুকু কমাতে পারে। জিল্লুরের মতো আর কোনো বাবার কোল যেন খালি না হয় এবং আর কোনো সন্তান যেন দালালের খপ্পরে পড়ে নিস্ব না হয়, এটাই এখন ঝিনাইদহবাসীর প্রত্যাশা। জিল্লুর রহমানের দ্রুত সুস্থতা এবং তার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসুক—এই দোয়াই এখন সবার মুখে মুখে।
















