আলমগীর শরীফ, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার প্রতিটি কৃষকের দোরগোড়ায় সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিতে শুরু হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত এই বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজাপুর উপজেলা কৃষি অফিস এখন পুরোদমে মাঠে নেমেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার সময় উপজেলার বড়ইয়া ইউনিয়নে চলমান এই কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন উপজেলা কৃষি অফিসার মোসাঃ শাহিদা শারমিন আফরোজ। তিনি সরাসরি কৃষকদের সাথে কথা বলেন এবং তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখেন। গত ১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই জরীপ ও তথ্য সংগ্রহের কাজ আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে বলে জানা গেছে।
পরিদর্শনকালে কৃষি অফিসার শাহিদা শারমিন আফরোজ বড়ইয়া কাছারিবাড়ী বাজারে অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ কৃষকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। তিনি জানান, সরকার এবার শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, “আমরা চাই একজন পেশাদার কৃষকও যেন এই তালিকা থেকে বাদ না পড়েন। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সারের ভর্তুকি, উন্নত মানের বীজ এবং অন্তত ২০% থেকে ৩০% ছাড়ে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে এই কার্ডধারী কৃষকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ পাবেন।” তিনি আরও জানান, এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে উপজেলার ৯৫% এর বেশি কৃষককে এই ডাটাবেজের আওতায় নিয়ে আসার।
উক্ত পরিদর্শন সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বড়ইয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ মোঃ ফারুক ফকির এবং গালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ আমিনুল ইসলাম। তারা দুজনেই কৃষি অফিসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। ফারুক ফকির তার বক্তব্যে বলেন, “অতীতে আমরা দেখেছি অনেক সময় প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং অকৃষকরা অনৈতিকভাবে কার্ড বাগিয়ে নিয়েছেন। তবে এবার আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। বড়ইয়া ইউনিয়নে কোনোভাবেই কোনো অকৃষক যেন এই কার্ড না পায়, সেদিকে আমাদের কর্মীদের কড়া নজর রাখতে হবে। আমরা চাই প্রকৃত কৃষকের মুখে হাসি ফুটুক।” স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সমাজসেবক মোঃ গোলাম কিবরিয়া বাদলও একই সুর মিলিয়ে বলেন যে, তালিকা প্রণয়নে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না।
তথ্য সংগ্রহের এই কাজে নিয়োজিত আছেন উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার পলাশ হালদার, সৌরভ মিস্ত্রী ও পল্লব মজুমদার। তারা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষকদের জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করছেন। তারা জানান, এবার আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে যাতে কোনো ভুল তথ্য সিস্টেমে ইনপুট না হয়। রাজাপুর সাংবাদিক ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি সাংবাদিক মোঃ আলমগীর শরীফ এসময় উপস্থিত থেকে মাঠ পর্যায়ের এই চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, প্রচার-প্রচারণা বাড়ালে কৃষকরা আরও বেশি সচেতন হবেন এবং সঠিক তথ্য দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।
সভায় উপস্থিত সাধারণ কৃষকদের মাঝেও বেশ উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। কৃষক ইলিয়াস শরিফ ও রুহুল আমিন জানান, তারা আগে অনেকবার সাহায্যের জন্য দৌড়ঝাঁপ করেছেন কিন্তু সঠিক কার্ড না থাকায় সুবিধা পাননি। এবার কৃষি অফিসার নিজে মাঠে আসায় তারা আশার আলো দেখছেন। কৃষাণী হনুফা বেগম বলেন, “আমরা কামলা খাটি, চাষবাস করি। সরকার যদি আমাদের সরাসরি সুবিধা দেয়, তাহলে এবার বেশি করে ধান আর সবজি চাষ করব।” সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোঃ নুরুজ্জামান, সুমন হাওলাদার, ফায়জুল ইসলাম, আরিফ হাসান লুৎফর, ইব্রাহীম আকন এবং ক্রীড়াবিদ আমিনুল ইসলাম ফকির। কলেজ শিক্ষার্থী সজীব হোসেনও এই কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করছেন।
কৃষি অফিসার মোসাঃ শাহিদা শারমিন আফরোজ উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করেন যে, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষি ঋণের প্রক্রিয়াও সহজতর হবে। কৃষকরা যেন মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ না নিয়ে সরকারি ব্যাংক থেকে মাত্র ৪% থেকে ৫% সুদে ঋণ নিতে পারেন, সরকার সেই ব্যবস্থা করছে। তিনি বলেন, “কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাই কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে এই কার্ড হবে একটি ডিজিটাল চাবিকাঠি।” তিনি আরও যোগ করেন যে, যদি কোনো কৃষক তথ্য দিতে গিয়ে কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন বা কেউ যদি টাকা দাবি করে, তবে সরাসরি উপজেলা কৃষি অফিসে অভিযোগ করতে হবে। কারণ এই কার্ড প্রাপ্তির জন্য কোনো অতিরিক্ত খরচ বা ফি নেই।
বড়ইয়া ইউনিয়নের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ আমিনুল ইসলাম জানান, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে জরীপ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই জরীপ শেষ হলে বড়ইয়া ইউনিয়নের কৃষিতে এক আমূল পরিবর্তন আসবে। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের মতো বড়ইয়াতেও যেন দ্রুততম সময়ে স্মার্ট কার্ড পৌঁছে যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই স্বচ্ছ জরীপ প্রক্রিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং নিয়মিতভাবে মাঠ পর্যায়ের খবর তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন।
অবশেষে সভার সমাপ্তি ঘটে এক সুন্দর পরিবেশের মধ্য দিয়ে। কৃষি অফিসার শাহিদা শারমিন আফরোজ মাঠ পর্যায়ে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন তারা কোনোভাবেই চাপের মুখে নতি স্বীকার না করেন এবং নির্ভুল তালিকা জমা দেন। রাজাপুর উপজেলার এই কৃষি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি এখন অন্যান্য উপজেলার জন্য একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃষকদের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে যে, সঠিক তদারকি থাকলে সরকারি সেবা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানো সম্ভব। বড়ইয়ার মানুষ এখন প্রতীক্ষায় আছেন, কখন তাদের হাতে পৌঁছাবে কাঙ্ক্ষিত সেই কৃষক কার্ড, যা তাদের জীবনযাত্রার মান বদলে দেবে।
















