শৈলকূপায় ৩৫ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি সাহেব আলী গ্রেপ্তার: ধাওড়া গ্রামে পুলিশের ঝটিকা অভিযান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ এক সফল অভিযান চালিয়ে ৩৫ পিস ইয়াবাসহ মোঃ সাহেব আলী (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গত রাতে উপজেলার ধাওড়া গ্রামে এই অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তারকৃত সাহেব আলী ওই গ্রামের মৃত রিয়াজ মোল্লার ছেলে। পুলিশের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গোপনে মাদকের কারবার চালিয়ে আসছিলেন। তাঁর এই গ্রেপ্তারের খবরে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

শৈলকূপা থানা পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাঁরা জানতে পারেন যে ধাওড়া গ্রামের একটি বাড়িতে বিপুল পরিমাণ মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। এমন খবরের ভিত্তিতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে একটি চৌকস টিম দ্রুত অভিযানে নামে। পুলিশ সদস্যরা সাদা পোশাকে ওই এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। একপর্যায়ে সাহেব আলীর বসতবাড়ির উঠানে তাঁকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। পুলিশ তাঁকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; পুলিশ সদস্যরা দ্রুত তাঁকে জাপটে ধরেন। এরপর উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে তাঁর দেহ তল্লাশি করে ৩৫ পিস লালচে রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

বর্তমানে মাদক কারবারিরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। শৈলকূপার মতো কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতেও মাদকের থাবা বিস্তার লাভ করছে। পুলিশ জানায়, উদ্ধারকৃত ৩৫ পিস ইয়াবার বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট বাজারে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। এই ছোট ছোট নেশাদ্রব্যগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে এলাকার তরুণ সমাজকে। এলাকার সচেতন মহলের দাবি, গ্রামের ভেতরে এভাবে মাদক কেনাবেচা হওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সাহেব আলীর মতো ব্যক্তিরা যারা বয়সে প্রবীণ, তাঁরা যদি এমন অপরাধে লিপ্ত হন, তবে যুব সমাজ কার কাছ থেকে শিক্ষা নেবে এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

গ্রেপ্তারকৃত সাহেব আলীর বয়স বর্তমানে ৫৫ বছর। এই বয়সে এসেও তিনি কেন এমন মরণনেশা বিক্রির পথে পা বাড়ালেন, তা নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, অধিক মুনাফার লোভে তিনি অল্প অল্প করে ইয়াবা এনে এলাকার উঠতি বয়সী তরুণদের কাছে বিক্রি করতেন। বিশেষ করে ধাওড়া গ্রাম ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে তাঁর একটি ছোট সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। পুলিশ মনে করছে, সাহেব আলীর পেছনে আরও বড় কোনো মাদক সম্রাট থাকতে পারে। তাঁর এই গ্রেপ্তারের ফলে ওই চক্রের বাকি সদস্যদের ধরা এখন সহজ হবে বলে আশা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

শৈলকূপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা মাদকের বিরুদ্ধে ১০০% কঠোর অবস্থানে রয়েছি। মাদকের সাথে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না, সে যেই হোক না কেন। সাহেব আলীকে আমরা হাতেনাতে ধরেছি এবং তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, শৈলকূপা উপজেলাকে মাদকতিলক মুক্ত করতে তাঁরা নিয়মিত টহল ও চিরুনি অভিযান অব্যাহত রাখবেন। গ্রামবাসী যদি মাদক কারবারিদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করে, তবে এই কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। পুলিশের এই অনড় অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় সুধী সমাজ।

মাদকের প্রভাব বাংলাদেশে বর্তমানে একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের মধ্যে প্রায় ৮০% থেকে ৯০% ইয়াবায় আসক্ত। এই ৩৫ পিস ইয়াবা হয়তো খুব বেশি মনে না-ও হতে পারে, কিন্তু একটি ইয়াবাই একটি পরিবারের সুখ নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। ধাওড়া গ্রামের সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেন, সাহেব আলীর বাড়িতে প্রায়ই গভীর রাতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা যেত। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। এখন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করায় গ্রামবাসী নির্ভয়ে কথা বলছেন। অনেকেই দাবি করেছেন, এই মামলার সঠিক তদন্ত করে সাহেব আলীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আজ সকালেই ঝিনাইদহ জেলা আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, তাঁরা কেবল এই ৩৫ পিস ইয়াবাতেই সন্তুষ্ট নন; বরং এর উৎস কোথায় এবং সাহেব আলী কার কাছ থেকে এই মাদক কিনতেন, তা খুঁজে বের করা হচ্ছে। মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, পাইকারি ডিলারদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। শৈলকূপার ধাওড়া গ্রামের এই অভিযান অন্য মাদক কারবারিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সবশেষে, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে শুধু পুলিশি অভিযানই যথেষ্ট নয়। পরিবারের অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। আপনাদের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে সেদিকে নজর রাখা জরুরি। শৈলকূপার ধাওড়া গ্রামে ৩৫ পিস ইয়াবাসহ সাহেব আলীর গ্রেপ্তারের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অপরাধী যতই চতুর হোক না কেন, আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন। এলাকাবাসী আশা করছেন, প্রশাসন এভাবে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে শৈলকূপাকে একটি শান্ত ও মাদকমুক্ত জনপদ হিসেবে গড়ে তুলবে। আগামী দিনগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম আরও বেগবান হবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা

সম্পর্কিত নিবন্ধ