দল থেকে বহিষ্কার: এবার কি সংসদ সদস্য পদ হারাবেন গাজী নজরুল? আইনের মারপ্যাঁচে বড় প্রশ্ন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শুরুটা হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও দিয়ে। সেই ভিডিওর রেশ কাটতে না কাটতেই বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেলেন সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। নৈতিক স্খলনের দায়ে তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখন চরম সংকটে। দলের সাথে সম্পর্ক চুকে যাওয়ার পর এখন জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাঁর সংসদ সদস্য পদ কি থাকবে? নাকি দল থেকে বের করে দেওয়ার সাথে সাথেই তাঁর আসনটি শূন্য হয়ে যাবে? বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের নানা মারপ্যাঁচে বিষয়টি এখন বেশ জটিল অবস্থায় আছে।

গাজী নজরুল ইসলাম একজন সাধারণ নেতা নন। তিনি ১৯৯১ সালে প্রথমবার সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এবার তিনি তৃতীয়বারের মতো সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। জামায়াতের সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমিরের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন তিনি। তবে সম্প্রতি এক তরুণীর সাথে তাঁর একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সব ওলটপালট হয়ে যায়। গাজী নজরুল দাবি করেছিলেন ওই নারী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, কিন্তু জামায়াত তাঁদের দলীয় তদন্তে বিষয়টিকে ‘নৈতিক স্খলন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ মনে করছে, এতে দলের ভাবমূর্তি প্রায় ১০০% নষ্ট হয়েছে। তাই তারা তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এই বিষয়টি দ্রুতই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানাবে।

আমাদের সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য পদ থাকা বা না থাকা নিয়ে বিস্তারিত বলা আছে। ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেউ যদি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে অন্তত ২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তবে তাঁর সদস্যপদ থাকবে না। কিন্তু গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সাজার ঘটনা এখনো ঘটেনি। অন্যদিকে, ৭০ অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে দল যদি কাউকে বহিষ্কার করে, তবে তাঁর পদের কী হবে তা নিয়ে সংবিধানে সরাসরি কোনো স্পষ্ট ঘোষণা নেই। এই আইনি ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

অতীতে এমন ঘটনা বাংলাদেশে আরও কয়েকবার ঘটেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় জোট সরকারের আমলে অষ্টম সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তখন তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, দল বহিষ্কার করলেও আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে। তবে সেই সময়টি ছিল ২০০৮ সালের আগের, যখন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের কড়া নিয়মগুলো আজকের মতো ছিল না। ফলে আবু হেনার উদাহরণটি বর্তমান সময়ে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ পরবর্তীতে নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) অনেক পরিবর্তন এসেছে।

দশম সংসদে এ ধরনের একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে। বিতর্কিত মন্তব্য করার জেরে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল। তখন আওয়ামী লীগ দাবি করেছিল দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ায় বহিষ্কারের পর লতিফ সিদ্দিকীর আর সংসদে থাকার অধিকার নেই। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, প্রার্থী মানেই হলো দলীয় মনোনীত অথবা স্বতন্ত্র। যেহেতু লতিফ সিদ্দিকী মার্কা নিয়ে জিতেছেন, তাই বহিষ্কারের পর তিনি আর স্বতন্ত্র হওয়ারও আইনি পথ পাবেন না। তবে লতিফ সিদ্দিকী নিজেই পদত্যাগ করায় সেবার নির্বাচন কমিশনকে আর চূড়ান্ত আইনি রায় দিতে হয়নি।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন এই বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মত দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, যেহেতু একজন সংসদ সদস্য দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচিত হন, তাই দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া মানে তাঁর সদস্যপদও শূন্য হয়ে যাওয়া উচিত। তাঁর যুক্তি হলো, কোনো সংসদ সদস্য যদি স্বতন্ত্র হিসেবে না জিতে দলীয় ছাতার নিচে জয়লাভ করেন, তবে সেই ছাতা বা দল সরে যাওয়ার পর তাঁর আর সংসদে বসার কোনো আইনি ভিত্তি থাকা উচিত নয়। তিনি মনে করেন, নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর আর স্বতন্ত্র হওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই। এই যুক্তি যদি নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করে, তবে গাজী নজরুলের সংসদীয় আসনটি অচিরেই শূন্য হয়ে যাবে।

বর্তমানে গাজী নজরুলের নির্বাচনী এলাকা শ্যামনগরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে মিছিল-সমাবেশ করেছেন, এমনকি তাঁর বহিষ্কারের খবরে মিষ্টি বিতরণও হয়েছে। জামায়াত তাঁদের জায়গা থেকে কড়া বার্তা দিলেও গাজী নজরুল এখনো তাঁর পদ রক্ষার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে তিনি হয়তো বলতে চাইবেন যে, তাঁর কোনো জেল বা সাজা হয়নি, তাই তিনি এখনো যোগ্য। তবে ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা যদি নির্বাচন কমিশন কঠোরভাবে করে, তবে গাজী নজরুলের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠবে।

সব মিলিয়ে গাজী নজরুলের ভাগ্য এখন পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনি কতদিন সংসদে টিকে থাকতে পারবেন, তা বলা কঠিন। তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি যে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, তা নিশ্চিত। জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সবাই এখন তাকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশনের দিকে। যদি গাজী নজরুলের আসন শূন্য হয়, তবে সাতক্ষীরা-৪ আসনে নতুন করে উপ-নির্বাচন হবে। আর যদি তিনি টিকে যান, তবে সেটি হবে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে আর একটি বিরল আইনি লড়াইয়ের উদাহরণ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ