মোঃ আসাদুজ্জামান, বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় যৌতুকের লোভ আবারও কেড়ে নিতে চেয়েছিল একটি তাজা প্রাণ। মাত্র ৫ লাখ টাকার দাবির মুখে এক গৃহবধূকে যে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, তা শুনে এলাকাবাসী স্তম্ভিত। নিজের স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা মিলে গৃহবধূ সাবিনুর খাতুনকে বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং গলায় নাইলনের রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় ওই নারী বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা বীরগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন, যা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানাজানি হলে দেখা যায়, উপজেলার ৬নং নিজপাড়া ইউনিয়নের সন্তগাঁও গ্রামের মো. আব্দুস সালামের মেয়ে মোছা. সাবিনুর খাতুনের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী সম্বুগাঁও গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় সামাজিক রীতি মেনেই ৫ লাখ ১ হাজার টাকা বা প্রায় ৳৫,০১,০০০ দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল। পারিবারিকভাবে ধুমধাম করে বিয়ে হলেও সাবিনুরের ভাগ্যে সুখের দেখা মেলেনি। বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই স্বামী সাদ্দাম হোসেন, শাশুড়ি সামসুননাহার এবং দেবর সাদেকুল ইসলাম নতুন বায়না ধরেন। তাঁরা সাবিনুরের বাবার বাড়ি থেকে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা যৌতুক এনে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। দরিদ্র বাবার পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ টাকা দেওয়া সম্ভব নয় জেনেও অভিযুক্তরা সাবিনুরের ওপর ১০০% মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন।
গত ১৮ জুলাই ছিল সাবিনুরের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিন। বিকেল ৫টার দিকে অভিযুক্তরা আবারও সেই পুরনো যৌতুকের দাবি তোলেন। সাবিনুর যখন স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তাঁর বাবার পক্ষে ৫ লাখ টাকা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তখনই সাদ্দাম হোসেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, সাদ্দাম প্রথমে একটি শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে সাবিনুরকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে সাবিনুর যখন বাঁচার জন্য চিৎকার করছিলেন, তখন তাঁর শাশুড়ি ও দেবর তাঁকে জাপটে ধরেন। এরপর স্বামী সাদ্দাম একটি নাইলনের রশি সাবিনুরের গলায় পেঁচিয়ে ধরেন এবং শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সাবিনুর নিস্তেজ হয়ে পড়লে পাষণ্ডরা ভেবেছিল তিনি মারা গেছেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সাবিনুরকে মৃত ভেবে অভিযুক্তরা ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। দীর্ঘক্ষণ সাবিনুরকে বাড়ির আঙিনায় নিস্তেজ পড়ে থাকতে দেখে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সাবিনুরের বাবাকে জানান। খবর পেয়ে অসহায় বাবা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং মেয়ের নিথর দেহ উদ্ধার করেন। দ্রুত তাঁকে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, তাঁর শ্বাসনালীতে মারাত্মক আঘাত লেগেছে এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। বর্তমানে হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন সাবিনুর, আর বাইরে তাঁর পরিবার বিচার চেয়ে ঘুরছে।
এই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, সাদ্দাম হোসেন শিক্ষিত মানুষ এবং পেশায় কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (অটোমোবাইল অ্যান্ড অটো ইলেকট্রিক্যাল বেসিকস)। কিন্তু তাঁর আচরণ ছিল সম্পূর্ণ অমানবিক। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এটি সাদ্দামের প্রথম অঘটন নয়। এর আগে তাঁর এক স্ত্রী ছিলেন, যাঁর ওপরও তিনি নিয়মিত একই ধরনের নির্যাতন চালাতেন। সেই নির্যাতিতা নারীও একদিন প্রাণ বাঁচাতে সংসার ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সাদ্দামের পরিবারের সদস্যদের দৌরাত্ম্য এলাকার মানুষের কাছে রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাংবাদিকরা এ বিষয়ে সাদ্দাম হোসেনের সাথে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেন। প্রথমে তিনি এড়িয়ে গেলেও পরে কথা বলেন। তবে নিজের অপরাধের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে তিনি সাফ মানা করে দেন। তিনি দাবি করেন, এটি তাঁদের পারিবারিক বিষয় এবং এ নিয়ে বাইরের মানুষের মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তবে তাঁর এই রহস্যময় নীরবতা ও পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আরও জোরালো করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন সমাজ। একজন সরকারি ইনস্ট্রাক্টর হয়েও এমন জঘন্য কাজে লিপ্ত হওয়ায় শিক্ষকমহলেও ছি ছি পড়ে গেছে।
বীরগঞ্জ থানা পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। থানার অফিসার ইনচার্জ জানিয়েছেন, তাঁরা ইতোমধ্যে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। একজন নারীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, তদন্তে ১০০% নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সাবিনুরের বাবা আব্দুস সালাম চোখের পানি মুছে বলেন, “আমি কেবল আমার মেয়ের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিচার চাই। এই যৌতুকলোভী পশুদের জেল হওয়া উচিত যাতে অন্য কোনো বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।”
যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে এখনো কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সাবিনুরের ঘটনাই তার প্রমাণ। শত চেষ্টা করেও যেন এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করা যাচ্ছে না। বীরগঞ্জের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেবল আইন দিয়ে নয়, সামাজিক সচেতনতাও জরুরি। এলাকাবাসী দাবি তুলেছেন, সাদ্দাম হোসেনের মতো ব্যক্তিদের সরকারি চাকরিতে বহাল রাখা ঠিক নয়, কারণ তাঁরা সমাজের জন্য হুমকি। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ কত দ্রুত এই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারে এবং সাবিনুর তাঁর প্রাপ্য বিচার পান কি না।
















