ভিডিও কেলেঙ্কারিতে জামায়াত থেকে বহিষ্কার হলেন এমপি গাজী নজরুল: আসন কি শূন্য হবে?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর নিজ দল জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে। দলীয় তদন্তে তাঁর ‘নৈতিক স্খলন’ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই এই কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। গত বুধবার বিকেলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগ থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, দল থেকে বের করে দেওয়ার পর গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না। বিষয়টি এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কোর্টে চলে গেছে এবং এটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনা নিয়ে গত ৩ দিন ধরে পুরো দেশেই ব্যাপক তোলপাড় ও সমালোচনা চলছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জামায়াতের আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে একটি জরুরি বৈঠক বসে। সেই বৈঠকে দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত কমিটি স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে যে গাজী নজরুল বিয়ের আগে ওই নারীর সাথে একাধিকবার দেখা করে ‘পর্দা লঙ্ঘন’ করেছেন। এটি সংগঠনের ভাবমূর্তিকে ১০০% ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে শুধু সাধারণ সদস্য পদ কেড়ে নেওয়া এই ক্ষতির জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করে দলটির কেন্দ্রীয় পরিষদ। জামায়াত দ্রুতই তাঁদের এই সিদ্ধান্তের কথা নির্বাচন কমিশনকে লিখিতভাবে জানাবে।

৭৪ বছর বয়সী গাজী নজরুল এবার দিয়ে ৩ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১ সালেও তিনি একই আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন। ভিডিও ফাঁসের পর তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। গত ১৭ জুন তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই পারিবারিকভাবে এই বিয়ে করেছেন। তবে জামায়াতের তদন্ত কমিটি বলছে, বিয়ের আগের কর্মকাণ্ডগুলোই ছিল নিয়মবহির্ভূত এবং নৈতিকতা বিরোধী। এদিকে গাজী নজরুলের এলাকা শ্যামনগরে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে স্থানীয়রা। শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। সেখানে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানানো হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা এখন সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজের দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবেই তাঁর আসন শূন্য হবে। কিন্তু দল যদি কাউকে বহিষ্কার করে, তবে তাঁর পদের কী হবে—সে বিষয়ে সংবিধানে সরাসরি স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। অন্যদিকে ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে অন্তত ২ বছরের জেল হলে পদ যাবে। কিন্তু গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো সাজা হয়নি। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, যেহেতু তিনি দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নে জিতেছেন, তাই বহিষ্কারের পর তাঁর আর সংসদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যার ওপর।

এদিকে গাজী নজরুলের বিপদ শুধু দলের বহিষ্কারেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় হত্যাচেষ্টার একটি মামলা করেছেন তাঁরই ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। এই ওবায়দুর আবার ওই তরুণীর আপন মামা। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওবায়দুর তাঁর ভাগনির সাথে এমপির অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় তাঁকে বিভিন্ন সময় মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি গত ১৪ জুলাই এমপির নির্দেশে ৪ থেকে ৫ জন সহযোগী মিলে ওবায়দুরকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ এই মামলায় ইতোমধ্যে আমিনুর রহমান নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্ত করে আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার বিবরণে আরও উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওবায়দুরের দাবি অনুযায়ী, মগবাজারের একটি চক্র ওই ‘অপ্রীতিকর ভিডিও’ ব্যবহার করে এমপিকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছিল। গাজী নজরুলের সন্দেহ ছিল, তাঁর চালক ওবায়দুরই গোপনে এসব ভিডিও ধারণ করে বাইরের মানুষের কাছে সরবরাহ করেছেন। সেই সন্দেহের জের ধরেই ওবায়দুরের ওপর চড়াও হন এমপি ও তাঁর লোকজন। যদিও জামায়াতের কোনো কোনো নেতা মনে করছেন এমপি একটি পরিকল্পিত চক্রান্তের শিকার হয়েছেন, তবে সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁরা কোনো ছাড় দিতে রাজি নন। বর্তমানে মামলাটি পল্লবী থানা পুলিশ গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক বলছেন, একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের কাছ থেকে এমন আচরণ সমাজ আশা করে না। এতে করে গোটা এলাকার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। জামায়াতও তাদের বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, নৈতিকতার প্রশ্নে তাঁরা আপসহীন। এখন সবার নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে। যদি কমিশন মনে করে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে তাঁর সদস্য পদ আর বৈধ নয়, তবে ওই আসনে উপ-নির্বাচনের ঘণ্টা বাজতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি নজির হয়ে থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ৩ বারের প্রবীণ এই এমপিকে জীবনের এই সায়াহ্নে এসে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। একদিকে দলের কড়া সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে পরিবারের ভেতরে মামলা আর সামাজিক লজ্জা সব মিলিয়ে তিনি এখন কোণঠাসা। নির্বাচন কমিশন খুব শীঘ্রই জামায়াতের চিঠির প্রেক্ষিতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ততক্ষণ পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর ভাগ্য ঝুলে থাকছে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু এটাই দেখতে চায় যে, এই নৈতিক অবক্ষয়ের বিচার প্রচলিত আইন ও দেশের সংবিধান অনুযায়ী কতটা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ