মোঃ আসাদুজ্জামান, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
মানুষ গড়ার কারিগররা যখন দীর্ঘ কর্মজীবন শেষ করে অবসরে যান, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, বরং নৈতিক কর্তব্য। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে ঠিক এই অনন্য দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি। এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নগদ ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সম্মান আর ভালোবাসায় সিক্ত হলেন তাঁরা, যারা জীবনের দীর্ঘ সময় বিলিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানের আলো ছড়াতে।
বুধবার (২২ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে পীরগঞ্জ উপজেলা হলরুমে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। হলরুমটি কানায় কানায় পূর্ণ ছিল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও স্থানীয় সুধীজনদের উপস্থিতিতে। এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার। তিনি তাঁর বক্তব্যে শিক্ষকদের এই মহতী উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বর্তমান সময়ে যখন নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটছে, তখন শিক্ষকদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা সমাজের জন্য একটি বড় বার্তা। তিনি মনে করেন, শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠনগুলোরও বড় দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে মোট ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি বিশাল তহবিল বিতরণ করা হয়। মূলত অবসর নেওয়া শিক্ষকদের আর্থিক দুশ্চিন্তা কিছুটা কমানোর লক্ষ্যেই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, তাঁদের এই ফান্ডের শতভাগ অর্থাৎ ১০০% অর্থই শিক্ষকদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। বর্তমান বাজারের আকাশচুম্বী মূল্যের সময়ে এই আর্থিক সহায়তা প্রবীণ শিক্ষকদের পরিবারে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। উপস্থিত শিক্ষকরা আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সহায়তার আওতা বাড়ানো হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান জুয়েল, পীরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক নসরতে খোদা রানা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি রুহুল আমিন, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজা এবং সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান মানু। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের বক্তব্যে শিক্ষকদের মর্যাদার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বলেন, একজন শিক্ষক কখনো পুরনো হন না, বরং তাঁর অভিজ্ঞতা সমাজকে সঠিক পথ দেখায়। তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও সঠিক মূল্যায়ন করা সভ্য সমাজের লক্ষণ।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, পীরগঞ্জ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক ও কৃষ্টপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশে বলেন, “আমাদের সহকর্মীরা অবসরের পর যেন নিজেদের অবহেলিত মনে না করেন, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।” তাঁর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক ও খনগাঁও বিশ্বাসপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কমল কান্তি রায় বলেন, শিক্ষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোনো সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন লোহাগাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক এবং ফকিরগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানসহ আরও অনেকে।
চেক এবং সম্মাননা স্মারক হাতে পাওয়ার পর অনেক প্রবীণ শিক্ষকের চোখে আনন্দাশ্রু দেখা যায়। দীর্ঘ ৩০ থেকে ৩৫ বছর শিক্ষকতা করার পর সহকর্মীদের কাছ থেকে এমন বিদায়ী সংবর্ধনা ও সহায়তা তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই টাকা আমাদের কাছে কেবল অংক নয়, এটি আমাদের প্রতি আমাদের উত্তরসূরিদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক। তাঁরা মনে করেন, যদি সমাজের প্রতিটি স্তরে শিক্ষকদের এভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তবে তরুণ প্রজন্ম শিক্ষকতা পেশায় আসতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হবে।
সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, ভবিষ্যতে শিক্ষকদের চিকিৎসাসেবা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনাও তাঁদের রয়েছে। পীরগঞ্জের এই অনুষ্ঠানটি কেবল টাকা বিতরণের একটি প্রথাগত অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল শিক্ষকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির এই মডেল সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে, যাতে কোনো শিক্ষককেই অবসরের পর মানবেতর জীবনযাপন করতে না হয়।
সবশেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। পীরগঞ্জের এই মহতী উদ্যোগ স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এলাকাবাসী মনে করছেন, এমন চর্চা অব্যাহত থাকলে সমাজে শিক্ষকদের হারানো গৌরব ফিরে আসবে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে। ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার এই চেকগুলো আসলে দীর্ঘদিনের নিরলস সেবার এক ক্ষুদ্র উপঢৌকন মাত্র, যা প্রবীণ শিক্ষকদের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়েছে।
















