দিল্লিতে তুলকালাম: মোদির বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের ধরনা, পুলিশের ধাক্কায় রক্তাক্ত রাহুল গান্ধী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত মঙ্গলবার এক নজিরবিহীন নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী থাকল বিশ্ব। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা খোদ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্ণায় বসেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই টানটান উত্তেজনার পর পুলিশি অ্যাকশনে পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধস্তাধস্তি হয়। এই ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রাহুল গান্ধীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মূলত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার বিকেলে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিট (NEET) পরীক্ষায় দুর্নীতির প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা জড়ো হন ৭ লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে। সেখানে তারা রাস্তায় বসে স্লোগান দিতে শুরু করেন। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন হঠাৎ ধরনা কর্মসূচি পুলিশ ও প্রশাসনকে হতবাক করে দেয়। প্রায় ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ধরে চলা এই অবস্থানে এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ও স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলতে আসেন। সরকার পক্ষ থেকে বুধবার সংসদে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও রাহুল গান্ধী তাতে রাজি হননি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, শুধু আলোচনা নয়, বরং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা সরবেন না।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দিল্লি পুলিশ জবরদস্তি করে নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে যখন বাসে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন তারা মাটিতে শুয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রায় ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্য মিলে রাহুল গান্ধীকে টেনে-হিঁচড়ে বাসে তোলার সময় ধস্তাধস্তিতে তার নাকে আঘাত লাগে এবং রক্ত ঝরতে শুরু করে। এই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয়ে যায়। পুলিশের এমন আচরণকে ‘অমানবিক’ ও ‘গণতন্ত্রের ওপর আঘাত’ বলে অভিহিত করেছে বিরোধী দলগুলো। রাহুলকে পরে ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ভারতের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। গত সোমবার দিল্লির রাজপথে প্রায় ৫০,০০০ শিক্ষার্থীর এক বিশাল মিছিলে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। দেশটির ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গত দুই মাস ধরে নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে। এই আন্দোলনের সমর্থনে লাদাখের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক গত ২৪ দিন ধরে অনশন করছেন। সিজেপির পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে: প্রথমত, শিক্ষামন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ; দ্বিতীয়ত, অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি; এবং তৃতীয়ত, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় হতাশ হয়ে যে ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। সরকার এখন পর্যন্ত এসব দাবির একটিও মেনে না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ কয়েকটি বার্তায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “ছাত্রদের ওপর আক্রমণ প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর আক্রমণের শামিল। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন তিনি কোনো জবাবদিহি না করেই পার পেয়ে যাবেন, কিন্তু এবার তা হবে না।” তিনি আরও বলেন, দেশের ১০০% যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই সরকার। রাহুল গান্ধীর এই বার্তার পর অনেক সাধারণ মানুষ ও দেশপ্রেমিক পরিবারও এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। শুধু কংগ্রেস নয়, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলেসহ আরও অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই ধরনায় সামিল হয়েছিলেন।

আন্দোলন কেবল দিল্লির রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। দিল্লি হাইকোর্ট ইতিমধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন যে সোনম ওয়াংচুককে তার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর অধিকার দিতে হবে। অন্যদিকে, মঙ্গলবার রাতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে মন্দির মার্গ থানায় আটকে রাখা হলে সাবেক কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী নিজে সেখানে ছুটে যান। প্রিয়াঙ্কাকে মুক্ত করার আগ পর্যন্ত সেখানেও এক প্রকার উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সরকার আলোচনার কথা বললেও আসলে পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। বিশেষ করে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি যে উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার এখন অনিশ্চিত।

বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে, তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় ১০০% বদ্ধপরিকর। মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিল কিন্তু বিরোধীরাই রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ধর্ণার নাটক করছে। তবে কংগ্রেসের পাল্টা দাবি, বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং এর দায় বর্তমান সরকারকে নিতেই হবে। গত কয়েক বছরে ভারতে এই ধরনের জালিয়াতি ২০% থেকে ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন বেসরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে এমন দুর্নীতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

সবশেষে বলা যায়, মঙ্গলবার দিল্লির রাস্তায় রাহুল গান্ধীর রক্ত ঝরার ঘটনা ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এমন অবস্থান কর্মসূচি ভারতের ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায় না। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এখন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিকার না হলে এবং দোষীদের শাস্তি না দিলে এই আন্দোলন আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ভারতের সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থী সমাজ এখন তাকিয়ে আছে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের দিকে। সেখানে সরকার এবং বিরোধীদের এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, তাই এখন দেখার বিষয়। শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দেশটির সরকার শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়, তা জানতে মুখিয়ে আছে পুরো ভারত।

সম্পর্কিত নিবন্ধ