ভাইরাল ভিডিও নিয়ে মুখ খুললেন জামায়াত এমপি গাজী নজরুল: ষড়যন্ত্র না দাম্পত্য অধিকার?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জেলাজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। সোমবার রাত থেকে ভিডিওটি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হতে থাকে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ভিডিওটিতে এমপিকে এক তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। তবে ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমপি নজরুল তার ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো বিষয়টিকে তার বিরুদ্ধে এক গভীর ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভিডিওর ওই তরুণী তার বিবাহিত স্ত্রী এবং তাদের একান্ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে এই ভিডিওটি অসৎ উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভিডিওটি প্রথম কখন এবং কীভাবে প্রকাশিত হলো তা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, ভিডিওটি সম্ভবত ঢাকার কোনো একটি বাসার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগ্রহ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও চরম চাঞ্চল্য বিরাজ করছে। অনেকে বিষয়টিকে এমপির ব্যক্তিগত জীবন বনাম সামাজিক নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও দলের পক্ষ থেকে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে এমপি নিজে বিষয়টিকে পারিবারিক ও রাজনৈতিক শত্রুতার ফল হিসেবে দেখছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার সামাজিক মর্যাদা ১০০% ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই নোংরা কৌশল অবলম্বন করেছে।

এমপির দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা অর্থাৎ তার শ্বশুর মো. মাসুম বিল্লাহর একটি ব্যবসায়িক অফিস রয়েছে। তারা প্রায় ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট বা ৭৫ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন। নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সেই সময় তার গাড়িচালক এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখাশোনার নাম করে বাইরে যান। কিছু সময় পর ওবায়দুল্লাহ ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে হঠাৎ কক্ষে ঢুকে পড়েন। এমপি দাবি করেন, সেখানে তাদের জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ টাকা (১০০,০০০ টাকা) হাতিয়ে নেওয়া হয়।

গাজী নজরুল ইসলামের অভিযোগের আঙুল সরাসরি তার নিজের গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহর দিকে। তিনি দাবি করেছেন, ওবায়দুল্লাহ ও তার সহযোগীরা কেবল টাকা আদায় করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা এমপির চলাচলের ভাড়া করা গাড়িটিও পরবর্তী সময়ে আটকে রাখে। দফায় দফায় আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করার পর এমপি তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। নজরুলের মতে, তার শ্বশুরের সাথে ওবায়দুল্লাহর পুরনো শত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের প্রতিশোধ নিতেই ওবায়দুল্লাহ এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পরিকল্পনা করে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত গোপনে রেকর্ড করা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করাকে তিনি একটি বড় ধরনের সাইবার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ভিডিওর ওই তরুণীর সাথে তার সম্পর্কের বৈধতা নিয়েও নজরুল বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন যে, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তার প্রথম স্ত্রীর পূর্ণ সম্মতিতে মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে মরিয়ম বেগমের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ভিডিওতে দেখা যাওয়া সম্পর্কটি মোটেও ‘বিবাহবহির্ভূত’ বা অবৈধ কিছু নয়। তিনি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার একটি উদ্দেশ্যপ্রোণোদিত অপপ্রচার।” যারা তার নৈতিক চরিত্র নিয়ে নোংরামি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি ১০০% জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে আসল অপরাধীরা ধরা পড়বে।

এদিকে এই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ফেসবুক ও ইউটিউবে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। ভিডিওটি ইতিমধ্যে কয়েক লাখ বার দেখা হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এটি শেয়ার করেছেন। অনেকে এটাকে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার হিসেবে দেখছেন এবং গোপন ক্যামেরায় ভিডিও ধারণের নিন্দা জানাচ্ছেন। আবার অনেকে একজন জন প্রতিনিধির কাছ থেকে এমন ভিডিও আশা করেন না বলে মন্তব্য করছেন। বিশেষ করে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা একটু বেশি হচ্ছে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমতি ছাড়া কারো ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যার সাজা কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে।

বর্তমানে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন এবং তিনি মানহানি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, তার কাছে সব ধরনের প্রমাণ রয়েছে যে এই ভিডিওটি ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে নানামুখী জল্পনা চললেও অনেকেই বিষয়টির সত্যতা জানার জন্য অপেক্ষা করছেন। এখন দেখার বিষয় হলো, ওবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর মামলা হয় কি না এবং জামায়াতে ইসলামী তাদের এই নেতার বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় কি না। তবে এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ যেকোনো সময় একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে দিতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ