এক সময় মনে করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে হাম বা ‘হাম-রুবেলা’র মতো রোগগুলো প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। কিন্তু চলতি বছর সেই ভুলতে বসা হামই দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন মানুষ হাম কিংবা এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সময়ে বিশ্বের আর কোনো দেশে এত বিপুল সংখ্যক হামের রোগী পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে হাম ও রুবেলা সংক্রমণের যে চিত্র ডব্লিউএইচও নিয়মিত প্রকাশ করে, তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সংক্রমণের এই ঢেউ অত্যন্ত মারাত্মক। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত, যেখানে রোগীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৬০৭ জন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেন ১৪ হাজার ৫২১ জন রোগী নিয়ে রয়েছে তৃতীয় স্থানে। তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে মেক্সিকো, পাকিস্তান, ক্যামেরুন এবং সুদানের মতো দেশগুলো থাকলেও বাংলাদেশের সংক্রমণের হার সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এখন হামের বড় সংকটে রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবচাইতে আশঙ্কাজনক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশে কেবল সংক্রমণের হারই বেশি নয়, মৃত্যুর সংখ্যাও রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে অন্তত ৭৯৭টি শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে ৯৫টি শিশুর ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরিতে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং বাকি ৭০২ জন মারা গেছে হামের স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বাংলাদেশে এবার হামে মৃত্যু বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ গত কয়েক বছর আগেও চিত্রটি ছিল একেবারেই ভিন্ন। ২০২২ সালে যেখানে দেশে মাত্র ৩১১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে এসে এটি কয়েক হাজারে ঠেকেছে। মূলত চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করে এবং এপ্রিল মাস নাগাদ তা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
কেন হঠাৎ বাংলাদেশে হামের এমন মহামারি দেখা দিল, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে মূল কারণ হলো টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি। একটা সময় টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্য ছিল সারা বিশ্বের জন্য উদাহরণ। ২০০৬ বা ২০১৪ সালের ক্যাম্পেইনগুলোতে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ১০০% অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে। দেখা গেছে, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার মাত্র ৫৯% শতাংশে নেমে আসে। দেশের অনেক জায়গায় টিকার তীব্র সংকটও দেখা দেয়। ডব্লিউএইচও-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮০% শিশুর হামের টিকার কোনো ডোজই নেওয়া ছিল না।
এই টিকাসংকটের পেছনে নীতিগত কিছু সিদ্ধান্তের ভুলকেও দায়ী করছেন অনেকে। জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের মতে, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত আন্তর্জাতিক পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে তারা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ইউনিসেফ তখন সতর্ক করেছিল যে, এই পরিবর্তনের ফলে টিকা সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হতে পারে এবং দেশে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। টিকার সঠিক সরবরাহ না থাকায় এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকি কমে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, আমরা দীর্ঘদিনের টিকাদানের ঐতিহ্যকে অবহেলা করেছি, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে শত শত শিশুর প্রাণ দিয়ে।
হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক রোগগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এই সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে হলে কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার অন্তত ৯৫% শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হার্ড ইমিউনিটি এক দিনে তৈরি হয় না, আবার এক দিনে ভেঙেও পড়ে না। টানা দুই বছর টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় ধীরে ধীরে এই সুরক্ষা দেয়াল ভেঙে পড়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিলে একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করলেও তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হিসেবে দেখা গেছে, এই ক্যাম্পেইন থেকেও প্রায় ৪৬ লাখ শিশু বাদ পড়ে গেছে। স্বাস্থ্যবিভাগের তথ্যে গরমিল থাকায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের অর্ধেকই কোনো টিকা পায়নি। অথচ হামে মৃত শিশুদের ৫২% শতাংশেরই বয়স ছিল ৯ মাসের কম। এই ছোট শিশুদের সুরক্ষা দিতে হলে তাদের মায়েদের এবং আশেপাশের বড় শিশুদের শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের কাজে সমন্বয়হীনতা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকায় সংক্রমণের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না।
সবশেষে বলা যায়, হামের এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। টিকার অভাবে শিশুদের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফ বারবার তাগাদা দিচ্ছে যে, যারা টিকার বাইরে আছে তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই সংক্রমণের ঢেউ দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে। কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা ক্যাম্পেইন করলেই হবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে ১০০% তদারকি নিশ্চিত করে প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষা দিতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে যেন তারা শিশুদের সঠিক সময়ে কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটি শিশুর মৃত্যুও যেন আর না হয়, সেই অঙ্গীকারই হোক বর্তমান সময়ের প্রধান অগ্রাধিকার।
















