দেশের অর্থনীতির চাকা যেন কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.২২ শতাংশে। এই হার অর্থবছরের আগের দুটি প্রান্তিকের তুলনায় বেশ কম, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৯৬ শতাংশ এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৩.০৩ শতাংশ, সেখানে তৃতীয় প্রান্তিকে এসে তা ২ শতাংশের ঘরে নেমে আসা চিন্তার বিষয়। সাধারণ মানুষের ভাষায় বলতে গেলে, দেশে নতুন সম্পদ তৈরির গতি আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
অর্থনীতির এই শ্লথগতির পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেকোনো নির্বাচনের আগে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। বিনিয়োগকারীরা টাকা ছাড় করতে ভয় পান এবং নতুন কোনো প্রকল্প শুরু করার বদলে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেন। এর প্রভাব আমরা সরাসরি জিডিপির পরিসংখ্যানে দেখতে পাচ্ছি। এছাড়া বিদায়ী অর্থবছরের পুরো সময়টাই উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যায় ছিলেন। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গ্রাফটি নিচের দিকেই নামছে।
জিডিপি আসলে কী, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকতে পারে। সহজ কথায়, জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছর বা তিন মাস) দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী হচ্ছে বা পিছিয়ে পড়ছে, তা এই জিডিপি দিয়েই মাপা হয়। যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যায়, তখন বুঝতে হবে দেশে কলকারখানায় উৎপাদন কমছে, মানুষের আয় কমে যাচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। বিবিএসের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের পুরো সময়ে প্রবৃদ্ধির হার সাময়িকভাবে ৪.১৪ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবারের পরিসংখ্যানের সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো শিল্প খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ০.২৮ শতাংশ (-০.২৮%)। এর মানে হলো, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এবার শিল্প কারখানায় উৎপাদন বাড়ার বদলে উল্টো কমেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। শিল্প খাতে এমন স্থবিরতা চললে দেশের রপ্তানি আয়েও বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা থাকে। যেখানে ৫% থেকে ৭% প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা, সেখানে মাইনাস প্রবৃদ্ধি আমাদের শিল্পায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প খাত পিছিয়ে পড়লেও কৃষি ও সেবা খাত কোনোমতে অর্থনীতিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৭৪ শতাংশ। যদিও এটি খুব বেশি নয়, তবুও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও কৃষকরা উৎপাদন ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে সেবা খাত, যার মধ্যে ব্যাংক, বিমা, পরিবহন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পড়ে, সেখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৫২ শতাংশ। বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির বড় অংশই এই সেবা খাতের ওপর টিকে আছে। তবে শিল্প খাত চাঙ্গা না হলে শুধু সেবা খাত দিয়ে জিডিপি দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
টাকার অঙ্কে হিসাব করলে দেখা যায়, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ভেতরে স্থির মূল্যে ৯ লাখ ৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকার সমপরিমাণ নতুন মূল্য সংযোজন হয়েছে। এর আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর-ডিসেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪০৩ কোটি টাকা। আর অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এর পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১০ কোটি টাকা। যদিও টাকার অঙ্কে পরিমাণটি বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু শতকরা হিসেবে প্রবৃদ্ধির হার টানা কমছে। এর অর্থ হলো, অর্থনীতি বড় হলেও যে গতিতে বড় হওয়ার কথা ছিল, সেই গতি আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ উত্তাল ছিল। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার পরিবর্তন ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বিবিএস বলছে, ওই সময়ের শ্লথগতির প্রভাব পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতেও ব্যাপকভাবে পড়ার আশঙ্কা আছে। যখন দেশে ১০০% স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ থাকে না, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যান। ফলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, অর্থনীতির এই নিম্নমুখী প্রবণতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যখন ৯% থেকে ১০% হারে বাড়ছে, তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২.২২ শতাংশে নেমে আসা মানে হলো মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া। সরকার যদি দ্রুত শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারে এবং ঋণের প্রবাহ সহজ না করে, তবে আগামী প্রান্তিকগুলোতে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারে। দেশের অর্থনীতিকে আবার ৫% বা ৬% প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে নীতিনির্ধারকদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
















