গাইবান্ধার উত্তর জনপদের গ্রামীণ জনপদে দিন দিন বাড়তে থাকা সামাজিক ব্যাধিগুলো রুখে দিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। সোমবার (২০ জুলাই) বিকেলে গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটী ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে আয়োজিত হয় এক বিশেষ মতবিনিময় সভা। এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল তরুণ সমাজকে মাদক, জুয়া এবং বাল্যবিবাহের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা। খোলাহাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম হক্কানীর সভাপতিত্বে এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ফুল দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেন। খোলাহাটী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা শত শত সাধারণ মানুষ এবং তরুণদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও সবুজ কুমার বসাক বলেন, একটি সুন্দর সমাজ গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মাদক আর জুয়া আমাদের বর্তমান প্রজন্মের মেধাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তিনি পরিসংখ্যান টেনে বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশের যুবসমাজের প্রায় ৩৫% থেকে ৪০% কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এই হার যদি আমরা এখনই না কমাই, তবে আগামী দিনে দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দেবে। তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার নামান্তর। ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দিলে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যেমন ১০০% বেড়ে যায়, তেমনি তারা মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ে। তাই প্রশাসন এখন থেকে শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত কাজী, ঘটক বা অভিভাবক কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশের একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সমাজের শত্রু। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ছোটখাটো জুয়া থেকে শুরু করে বড় ধরণের অপরাধের জন্ম হয়। তিনি উপস্থিত জনতাকে অনুরোধ করেন, যদি কোথাও মাদক বিক্রি বা জুয়ার আসর বসে, তবে যেন তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হয়। তিনি তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তা দেন। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জুয়ার কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা অবৈধভাবে হাতবদল হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০% থেকে ১৫% নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই টাকা যদি সঞ্চয় বা ভালো কাজে লাগানো হতো, তবে সমাজ আরও উন্নত হতো।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, মাদকাসক্তি শুধু শারীরিক ক্ষতি করে না, এটি একটি পরিবারকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। একেকজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাসে গড়ে ৫০০০ থেকে ১৫০০০ টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় রোধ করতে হলে আমাদের সন্তানদের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু আইন দিয়ে সব বন্ধ করা সম্ভব নয় যদি না অভিভাবকরা সচেতন হন। সন্তানদের বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা কোনো খারাপ সংশ্রবে না জড়ায়। তিনি মাদকাসক্তদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন।
সভাপতির বক্তব্যে চেয়ারম্যান মাসুম হক্কানী বলেন, খোলাহাটী ইউনিয়নকে আমরা একটি আদর্শ ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যেখানে কোনো মাদক ব্যবসায়ী থাকবে না, কোনো কিশোরী অকালে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না। তিনি বলেন, আমি আমার পরিষদের সকল সদস্যকে নির্দেশ দিয়েছি যেন প্রতিটি ওয়ার্ডে গিয়ে তারা মানুষকে সচেতন করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইউনিয়ন পরিষদ সার্বক্ষণিক কাজ করবে। সভায় স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষক এবং মসজিদের ইমামরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উপস্থিত সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং হাত তুলে শপথ নেন যে তারা তাদের এলাকাকে মাদকমুক্ত ও অপরাধমুক্ত রাখবেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে স্থানীয় কয়েকজন যুব প্রতিনিধি তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। তারা জানান, গ্রামে খেলাধুলার মাঠ বা বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বেকার যুবকরা বিপথে পরিচালিত হয়। ইউএনও সাহেব তৎক্ষণাৎ আশ্বস্ত করেন যে, খোলাহাটী ইউনিয়নের তরুণদের জন্য খেলাধুলার সরঞ্জাম এবং পাঠাগার স্থাপনে সরকার আর্থিক অনুদান প্রদান করবে। এই ঘোষণার পর পুরো চত্বর করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই এই সফল সভার সমাপ্তি ঘটে। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসনের এমন নিয়মিত মনিটরিং এবং জনসচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে গাইবান্ধার এই ইউনিয়নটি খুব শীঘ্রই একটি অপরাধমুক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাবে।
















