ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় মাদকবিরোধী এক বিশেষ অভিযানে একটি স্বর্ণের দোকানের ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখ, রবিবার রাত ঠিক ৮:৩০ মিনিটের দিকে শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল এই অভিযান পরিচালনা করে। গ্রেফতারকৃত ওই ব্যক্তির নাম শ্রী সঞ্জিত কর্মকার (৪৮)। তিনি শৈলকুপা থানাধীন ৮নং ওয়ার্ডের কবিরপুর গ্রামের মৃত সমর কর্মকারের ছেলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি পেশায় একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং নিজের জুয়েলারি দোকানের আড়ালেই দীর্ঘদিন ধরে এই নিষিদ্ধ মাদকের কারবার চালিয়ে আসছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে একটি বিশেষ দল থানা রোডে অবস্থিত ‘সরকার জেন্টস কালেকশন মার্কেট’-এ হানা দেয়। ওই মার্কেটের ভেতরে থাকা ‘সোনার তরী জুয়েলার্স’ নামক একটি ছোট স্বর্ণের দোকানে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে এমন খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত সেখানে পৌঁছায়। পুলিশ যখন দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন সঞ্জিত কর্মকারকে বেশ অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখা যায়। এরপর তল্লাশি চালিয়ে তাঁর কাছ থেকে মোট ১৪৩ (একশত তিতাল্লিশ) পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া মাদক বিক্রির নগদ ১,৭৯০/- (এক হাজার সাতশত নব্বই) টাকাও তাঁর কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে।
শৈলকুপা বাজারের মতো ব্যস্ততম জায়গায় একটি স্বর্ণের দোকানের ভেতর মাদক কেনাবেচার এমন ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সঞ্জিত কর্মকারকে সবাই একজন সাধারণ স্বর্ণশিল্পী হিসেবেই জানতেন। কিন্তু তাঁর দোকানের আড়ালে যে মরণনেশা ইয়াবার পাইকারি ও খুচরা কারবার চলত, তা কারো কল্পনাতেও ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েক বছরে এই এলাকায় মাদকের প্রকোপ প্রায় ৩০% থেকে ৪০% বেড়ে গেছে। বিশেষ করে যুবসমাজের বড় একটি অংশ এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। স্বর্ণের দোকানের মতো একটি আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এমন অবৈধ কাজ চলায় সাধারণ মানুষ এখন সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর সন্দেহ পোষণ করছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত ১৪৩ পিস ইয়াবার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৪২,০০০ টাকারও বেশি। খুচরা বাজারে একেকটি ইয়াবা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হতো। সঞ্জিত কর্মকার মূলত এই স্বর্ণের দোকানটিকে একটি ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। দিনের বেলা স্বর্ণের কাজ করলেও সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর দোকানে মাদকসেবী ও ছোট ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বাড়ত। পুলিশ এই চক্রের আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সঞ্জিত এই ইয়াবা কার থেকে সংগ্রহ করতেন এবং তাঁর এই নেটওয়ার্কে আরও কতজন জড়িত আছে, তা জানতে তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে।
ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। গত এক মাসে শৈলকুপা ও এর আশপাশের এলাকায় চালানো অভিযানে মাদকের পরিমাণ আগের চেয়ে প্রায় ২০% বেশি উদ্ধার হয়েছে। পুলিশের ধারণা, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ফাঁকি দিতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। কখনো কুরিয়ার সার্ভিস, কখনো ফলের ঝুড়ি, আবার কখনো এই স্বর্ণের দোকানের মতো বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ড ব্যবহার করছে তারা। সঞ্জিত কর্মকারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা করার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
শৈলকুপার সাধারণ নাগরিক সমাজ এই সফল অভিযানের জন্য পুলিশকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তাঁরা একই সঙ্গে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বাজারের ভেতর আরও অনেক দোকানে হয়তো এমন গোপন কারবার চলতে পারে। সচেতন মহলের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, যদি না সামাজিক সচেতনতা ১০০% নিশ্চিত করা যায়। প্রতিটি পরিবারের সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং সন্দেহজনক চলাফেরা দেখলে পুলিশকে জানানো এখন সময়ের দাবি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, ইয়াবা বা মিথাইল অ্যামফিটামিন বর্তমানে দেশের মাদক সমস্যার প্রায় ৭০% দখল করে আছে। এটি সেবনে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হূদরোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। শৈলকুপার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মাদক এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। একজন ৪৮ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী যখন এই পথে পা বাড়ান, তখন সেটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরই ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে যে, শৈলকুপা এলাকাকে মাদকভুক্ত করতে এমন আকস্মিক ও ঝটিকা অভিযান আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
অবশেষে বলা যায়, সঞ্জিত কর্মকারের গ্রেফতার শৈলকুপার মাদক কারবারিদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। পুলিশ সাধারণ মানুষের সহায়তা চেয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী এভাবে কোনো বৈধ পেশার আড়ালে সমাজবিধ্বংসী কাজ করতে না পারে। সরকার জেন্টস কালেকশন মার্কেটের সেই সোনার তরী জুয়েলার্স এখন পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মার্কেটের অন্যান্য ব্যবসায়ীদেরও সতর্ক করা হয়েছে। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের ফলে শৈলকুপাবাসী একটি শান্ত ও মাদকমুক্ত সুন্দর ভবিষ্যতের আশা করছেন।
















