বাংলাদেশি পাসপোর্ট থেকে বাদ পড়া সেই চিরচেনা শব্দবন্ধ ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) আবারও ফিরে এসেছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছে। মূলত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশের নৈতিক অবস্থানের কথা বিবেচনা করেই এই বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে নতুন যেসব ই-পাসপোর্ট তৈরি করা হবে, সেগুলোর প্রতিটিতে এই নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ইতিমধ্যে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পাসপোর্ট থেকে এই বিশেষ শব্দবন্ধটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। তখন প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ই-পাসপোর্ট পরিষেবা চালু করার সময় হুট করেই ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ওই সময় দেশের বিভিন্ন মহলে বেশ সমালোচনা হয়েছিল। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পাসপোর্টে এই পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া শুরু করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সভার পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে আজ এই সরকারি আদেশ জারি করা হলো। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় পাসপোর্টে ইসরায়েল শব্দবন্ধটি ফিরিয়ে আনা আমাদের জাতীয় সংহতিরই বহিঃপ্রকাশ।
নতুন আদেশে কেবল লেখায় পরিবর্তন আসেনি, বরং ই-পাসপোর্টের ভেতরের নকশা বা জলছাপেও এসেছে আমূল রদবদল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা এখন পাসপোর্টের পাতায় পাতায় শোভা পাবে। নতুন পাসপোর্টের জলছাপে যুক্ত করা হয়েছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত সেই সাহসী ছবি। এর পাশাপাশি উত্তরার আজমপুরে পানি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ এবং চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরামের ছবিও থাকছে। এই তিন বীরের ছবি সংবলিত অংশটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪’। এটি নতুন প্রজন্মের আত্মত্যাগকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
নতুন এই নকশায় আগের সরকারের আমলে যুক্ত করা বেশ কিছু স্থাপনা ও প্রতীকের ছবি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, যমুনা সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু), পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছবি। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ, মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ এবং মডেল মসজিদের ছবিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ছবি পাসপোর্টে থাকলেও সেখান থেকে ‘নৌকা’ চিহ্নটি বাদ দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, জাতীয় পরিচয়পত্রে দলীয় বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির আধিপত্যের বদলে জাতীয় ঐক্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তুলে ধরতে এবারের পাসপোর্টে সব ধর্মের প্রতীক সুবিন্যস্তভাবে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাতে বেশ কিছু নতুন ছবি থাকছে। জলছাপে থাকবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, লালবাগ দুর্গ এবং খ্রিষ্টধর্মের হলি রোজারি চার্চ। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, বান্দরবানের নীলগিরি, স্বর্ণমন্দির ও সুন্দরবনের ছবিও থাকবে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’ এবং ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল ও পানামনগরও থাকছে নতুন এই সংস্করণে।
জাতীয় প্রতীকগুলোর মধ্যে শাপলা, দোয়েল, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ছবিগুলো আগের মতোই থাকছে। তবে নকশায় কিছুটা পরিমার্জন আনা হয়েছে। চা-বাগান, সোনালি আঁশ পাট এবং রাজশাহীর আমবাগানের ছবি জলছাপে ব্যবহার করে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাসপোর্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৪৮ এবং ৬৪ পৃষ্ঠার ই-পাসপোর্টের বুকলেটে এই নতুন নকশা ব্যবহার করা হবে। এতে জলছাপগুলো এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে জালিয়াতি করা কঠিন হয় এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
নতুন এই নির্দেশনার ফলে পাসপোর্ট নবায়ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান পাসপোর্টধারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হবে না। যাদের পাসপোর্টের মেয়াদ এখনো রয়েছে, তাদের এখনই এটি পরিবর্তন করতে হবে না। তবে বর্তমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যখন কেউ নতুন করে নবায়ন করতে যাবেন, তখন তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই নতুন নকশার পাসপোর্ট হাতে পাবেন। ধাপে ধাপে দেশের সকল পাসপোর্ট এই নতুন সংস্করণে রূপান্তর করা হবে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাসপোর্ট আবার তার পুরোনো মর্যাদা ও স্বকীয়তা ফিরে পেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















