প্রাথমিকে শিক্ষক বদলির নিয়মে বড় পরিবর্তন: বাদ পড়ল ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’, যুক্ত হলো ৭ নতুন শর্ত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন এই সিদ্ধান্তে বদলি বা পদায়ন করার কমিটিতে আর কোনো ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ থাকতে পারবেন না। তাদের পরিবর্তে এখন থেকে কমিটিতে স্থান পাবেন প্রকৃত ‘বিদ্যোৎসাহী’ বা ‘শিক্ষানুরাগী’ ব্যক্তিরা। একই সাথে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বদলির এই পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও তদবিরমুক্ত রাখতে আরও ৭টি নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছে সরকার। গত ২১ জুন এক প্রজ্ঞাপনে এই বদলির নতুন পদ্ধতি চালু করা হলেও জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার নীতিমালাটি সংশোধন করা হয়। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষকদের মধ্যে তদবিরের যে আশঙ্কা ছিল, তা অন্তত ৭০% থেকে ৮০% কমে আসবে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছিল বদলি কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিষয়টি নিয়ে। গত মাসের নীতিমালায় বলা হয়েছিল, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুইজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসেবে থাকবেন। কিন্তু ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বলতে আসলে কাদের বোঝানো হচ্ছে, তা পরিষ্কার ছিল না। এতে সাধারণ শিক্ষকদের মনে ভয় ঢুকেছিল যে, স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক নেতারা এই পদে বসে বদলি বাণিজ্যে লিপ্ত হতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনে এই নিয়ে ১০০% নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিক্ষকদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনিক কাজে বাইরের মানুষ ঢুকলে সেখানে টাকার বিনিময়ে বা রাজনৈতিক তদবিরে বদলি হওয়ার সুযোগ বাড়বে। এই সমালোচনার মুখে মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে শিক্ষানুরাগীদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি স্তরের বদলি কমিটি এখন আরও প্রশাসনিক ও কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। উপজেলা বা থানা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। জেলা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বিভাগীয় কমিটির সভাপতিত্ব করবেন বিভাগীয় কমিশনার। আগে জাতীয় পর্যায়ের কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব। তবে পরিবর্তিত নিয়মে এখন এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। এছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন)। প্রশাসনের এই রদবদলের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে কিছুটা সরিয়ে সরাসরি বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে এবার ৭টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা ‘ফিল্টার’ যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম শর্তটি হলো একজন সহকারী শিক্ষকের চাকরির মেয়াদ অন্তত ২ বছর পূর্ণ না হলে তিনি বদলির জন্য আবেদনই করতে পারবেন না। এছাড়া একবার বদলি হওয়ার পর কমপক্ষে ৩ বছর না কাটলে পুনরায় বদলির সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে অবশ্যই ‘শূন্য পদ’ থাকতে হবে; পদ খালি না থাকলে কোনোভাবেই সেখানে কাউকে নিয়োগ বা বদলি করা যাবে না। তৃতীয় শর্তে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত আবেদন ছাড়া তাকে অন্য বিদ্যালয়ে বদলি করা যাবে না। তবে যদি বিশেষ জনস্বার্থে বা প্রশাসনিক কোনো প্রয়োজনে বদলি করতে হয়, তবে অবশ্যই জাতীয় কমিটির কাছ থেকে ১০০% অনুমতি নিতে হবে।

বদলির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিকেও কড়া নজর দিয়েছে মন্ত্রণালয়। চতুর্থ শর্ত অনুযায়ী, কোনো বিদ্যালয়ে যদি ৫ জন বা তার কম শিক্ষক থাকেন কিংবা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৪০ এর বেশি হয়, তবে সেই স্কুল থেকে কোনো শিক্ষককে অন্য কোথাও বদলি করা যাবে না। পঞ্চম শর্তটি হলো জ্যেষ্ঠতা বা সিনিয়রিটি। যদি একই স্কুলে শূন্য পদের বিপরীতে একাধিক শিক্ষক আবেদন করেন, তবে যিনি চাকরির বয়সে জ্যেষ্ঠ, তিনিই অগ্রাধিকার পাবেন। ষষ্ঠ শর্তে বলা হয়েছে, একটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ৩ জন শিক্ষককে ‘সংযুক্তি’ বা অ্যাটাচমেন্টে পদায়ন করা যাবে। এর বেশি কাউকে রাখা হবে না। সর্বশেষ ও সপ্তম শর্তটি নারী শিক্ষকদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। কোনো শিক্ষিকা যদি তার স্বামীর ঠিকানা বা স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি স্কুলে আসতে চান, তবে তিনি বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন।

আগের নিয়মে অনলাইন পদ্ধতিতে বদলির কথা বলা হলেও বর্তমান কাঠামোতে অনলাইন ও ম্যানুয়াল উভয় পদ্ধতির এক ধরনের সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। বলা হয়েছে, বদলি কমিটিগুলো প্রতি মাসে অন্তত একবার সভা করবে এবং জমা পড়া আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে দ্রুত নিষ্পত্তি করবে। একই উপজেলার মধ্যে বদলি হলে স্থানীয় কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু আন্তঃবিভাগ বা সিটি কর্পোরেশনের মতো বড় বদলিগুলোর ক্ষেত্রে সরাসরি জাতীয় কমিটির অনুমোদন লাগবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন এই পদ্ধতিতে লটারির মাধ্যমে নতুন শিক্ষকদের পদায়ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা কমিটিকে। এতে নিয়োগের শুরুতেই দুর্নীতির সুযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের এই নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেক শিক্ষক। তারা মনে করছেন, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ায় এখন সরাসরি প্রশাসনের সাথে কথা বলা যাবে। তবে ১:৪০ অনুপাত বজায় রাখার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের স্কুলগুলোর জন্য সমস্যা হতে পারে। কারণ অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা এমনিতেই খুব কম। তবুও ৭টি নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ার ফলে বদলি প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। মন্ত্রণালয় আশা করছে, এই স্বচ্ছতার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকরা আরও বেশি মনোযোগী হতে পারবেন এবং অযথা তদবিরের পেছনে সময় ও টাকা নষ্ট করা বন্ধ হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ