রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত বরিশাল বিভাগের বাসিন্দাদের প্রাণের সংগঠন ‘বরিশাল বিভাগ সমিতি, ঢাকা’-এর পরবর্তী মেয়াদের নেতৃত্ব নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ও বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে মতিঝিলের কিচেন ইয়ার্ড চাইনিজ ও পার্টি সেন্টারের ভিআইপি রুমে আয়োজিত সমিতির কার্যকরি পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সমিতির বর্তমান ও সাবেক শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে সংগঠনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং বরিশালের আঞ্চলিক উন্নয়নের নানা দাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জিয়াউল কবির দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুস ছোবাহান। পুরো সভাটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিচালনা করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রুবেল হাওলাদার। সভায় বক্তারা বলেন, একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা সমিতির প্রধান লক্ষ্য। তাই এবারের নির্বাচনকে শতভাগ নিরপেক্ষ করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যে একটি ৩ সদস্য বিশিষ্ট শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষে নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে সমিতির সকল সদস্য স্বাগত জানিয়েছেন।
ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক। তার সাথে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারা বেগম এবং সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো: আবদুস সামাদ। এই অভিজ্ঞ ও দক্ষ নির্বাচন কমিশন আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে যাবতীয় নিয়ম-কানুন ও তফসিল ঘোষণা করবেন। সভায় আরও জানানো হয় যে, যারা এই নির্বাচনে ভোট দিতে চান বা সদস্য হতে চান, তাদের জন্য ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই তারিখের মধ্যে সদস্যভুক্ত না হলে কেউ ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবেন না। সমিতির নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন, এবার ভোটার সংখ্যা গতবারের চেয়ে অন্তত ২০% থেকে ৩০% বৃদ্ধি পাবে।
সভায় সমিতির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সহ-সভাপতি ও সোনালী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) শওকত উল ইসলাম, সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব জ্ঞানেন্দ্র নাথ বিশ্বাস এবং বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা শরীফ সরোয়ার আশা। এছাড়া সিনিয়র জেলা জজ গোলাম কিবরিয়া, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ আবদুর রব হাওলাদার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ডক্টর মো: শাহ আলম সভায় তাদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: এনায়েত হোসেন আকন্দ এবং স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি মো: ইলিয়াস হোসেন মিরনসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে যে, এই সমিতি কেবল ঢাকায় বসে আড্ডা দেওয়ার জায়গা নয়, বরং এটি বরিশাল অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ের এক শক্তিশালী প্লাটফর্ম।
নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনার পাশাপাশি এই সভায় বরিশালের পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করা হয়। নেতৃবৃন্দ একমত হন যে, বরিশাল-ভোলা সেতু বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে বরিশাল বিভাগের শিল্প-কারখানা ও সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে সরবরাহের দাবি জানান তারা। এছাড়া ঢাকা-ভাঙা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার কাজের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, এই সড়কটি ৬ লেনে রূপান্তরিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র ১০০% বদলে যাবে এবং পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পাবে। এসব দাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বরিশাল বিভাগ সমিতি।
ভোলার গ্যাস প্রসঙ্গে সভায় বলা হয়, এই গ্যাস যদি বরিশালের বিসিক শিল্প নগরীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়, তবে সেখানে শত শত নতুন কলকারখানা গড়ে উঠবে। এতে করে স্থানীয় বেকারত্ব অন্তত ৪০% হ্রাস পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে বলেন, দেশের অন্য অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বরিশালের মানুষ কেন বঞ্চিত থাকবে? এই বৈষম্য নিরসনে সমিতি আগামীতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠক করবে এবং প্রয়োজনে রাজপথে কর্মসূচি পালন করবে। বরিশালের উন্নয়ন নিয়ে এই আপসহীন মনোভাব উপস্থিত সকল সদস্যের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
সভা শেষে প্রচার সম্পাদক সাংবাদিক রফিকউল্লাহ সিকদার আলোর পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আসন্ন ২৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও বরিশালের বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে সকল ফরম জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সমিতির এই নির্বাচন কেবল পদের লড়াই নয়, বরং এটি বরিশালের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হবে বলে সবাই আশা করছেন। সুষ্ঠু ও সুন্দর একটি নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসুক এমনটাই এখন সকল সদস্যের প্রত্যাশা।
বরিশাল বিভাগ সমিতির এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, শেকড়ের টানে তারা কতটা ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচনের মাধ্যমে যে নতুন কমিটি আসবে, তারাই আগামী দিনে বরিশালের স্বার্থরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সভা শেষে এক প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয় এবং বরিশালের আঞ্চলিক গান ও খোশগল্পে মুখর হয়ে ওঠে মতিঝিলের কিচেন ইয়ার্ড এলাকা। এখন সবার নজর ১৫ আগস্টের ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ এবং ২৬ সেপ্টেম্বরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে।
















