পীরগঞ্জে আল-হাসানা স্কুলের তিন ক্যাম্পাসজুড়ে জাঁকজমকপূর্ণ শিখন ও গণিত উৎসব-২০২৬: অংশগ্রহণ করল ২ হাজার শিক্ষার্থী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মোঃ আসাদুজ্জামান, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:

ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-হাসানা স্কুল। সম্প্রতি স্কুলটির তিনটি ক্যাম্পাসজুড়ে এক বিশাল বর্ণাঢ্য আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। ‘আন্তঃস্কুল শিখন ও গণিত উৎসব-২০২৬’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠানটি ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত পদচারণায় মুখরিত। দিনব্যাপী চলা এই উৎসবে শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রদর্শনী তুলে ধরে। মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি দূর করা এবং নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে তাদের মেধা বিকাশের লক্ষ্যেই এই বিশাল উৎসবের আয়োজন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এতে প্রায় ২,০০০ শিক্ষার্থী সরাসরি অংশ নেয়, যা পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

শনিবার (১৮ জুলাই) খুব সকাল থেকেই পীরগঞ্জের আল-হাসানা স্কুলের প্রতিটি ক্যাম্পাসে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। বর্ণিল ব্যানার, ফেস্টুন আর রঙিন কাগজে সাজানো হয় স্কুল প্রাঙ্গণ। সকাল ৯টায় প্রথমে প্রতিষ্ঠানের মূল ক্যাম্পাস-২ এ উৎসবের শুভ সূচনা হয়। এরপর সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে ক্যাম্পাস-১ এবং সর্বশেষ সকাল ১০টায় ক্যাম্পাস-৪ এ আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচির পর্দা উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. ইত্তাশাম-উল হক মিম। তিনি ফিতা কেটে উৎসবের সূচনা করার সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন শুধু মুখস্থ বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে। তারা যেন বাস্তব জীবনের সমস্যা গণিতের মাধ্যমে সমাধান করতে শেখে।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর আয়োজিত আলোচনা সভায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও স্কুলের অভিভাবক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন স্কুলের উপদেষ্টা মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন প্রধান শিক্ষক মো. রাশেদুল ইসলাম এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. বেলাল হোসেন। ক্যাম্পাস-৪-এর ইনচার্জ মো. খালেসুর রহমান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের প্রায় ১০০% উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অভিভাবকদের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, ২০২৬ সালের নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার কোনো বিকল্প নেই। এই ধরনের গণিত উৎসব তাদের চিন্তাশক্তিকে আরও ধারালো করবে।

এবারের উৎসবে তিনটি ক্যাম্পাসের প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী তাদের মেধার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ক্যাম্পাস-১ থেকে নার্সারি ও সিনিয়র কেজি শ্রেণির ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। ক্যাম্পাস-৪ থেকে অংশ নেয় প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, ক্যাম্পাস-২ এ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বড় শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বেশ কঠিন কিন্তু মজাদার সব গাণিতিক চ্যালেঞ্জ। উৎসবকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। ছোটদের জন্য ছিল ‘শিখন উৎসব’ এবং বড়দের জন্য ছিল ‘গণিত উৎসব’। প্রতিটি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের বিভিন্ন ধাঁধা এবং লজিক্যাল সমস্যার সমাধান করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে।

উৎসবের পরিবেশ ছিল দেখার মতো। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক অভিভাবকও স্কুল প্রাঙ্গণে ভিড় জমান। অনেক অভিভাবক জানান, তাদের সন্তানরা গণিত নিয়ে আগে বেশ ভয় পেত, কিন্তু এই উৎসবের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তারা এখন বেশ উৎসাহী। স্কুলের শিক্ষকরা প্রতিটি বুথে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করেন এবং বিভিন্ন গাণিতিক মডেল প্রদর্শন করেন। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রায় ৯৫% শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের টাস্ক সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে, যা একটি বড় অর্জন বলে মনে করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

পুরস্কারের ক্ষেত্রেও ছিল বিশেষ চমক। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিটি শ্রেণির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মাননা। এছাড়াও অতিরিক্ত ২০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে তাদের অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য নগদ অর্থ এবং আকর্ষণীয় সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হবে। পুরস্কার হিসেবে বিজয়ীদের হাতে ১,০০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অংকের নগদ অর্থ এবং বই তুলে দেওয়া হবে। মোট পুরস্কারের সংখ্যা এবং মান দেখে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উৎসাহিত বোধ করছে। এই পুরস্কার বিতরণের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ ও সুন্দর প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলা।

আয়োজকরা মনে করছেন, পীরগঞ্জের মতো জায়গায় এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে। আল-হাসানা স্কুলের এই উদ্যোগ দেখে আশেপাশের অন্যান্য স্কুলগুলোও এখন এমন উৎসব করার কথা ভাবছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জানান, ভবিষ্যতেও তারা এমন আয়োজন নিয়মিত করবেন এবং আগামী বছর অংশগ্রহণের সংখ্যা ১০% থেকে ১৫% বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তারা বিশ্বাস করেন, আজকের এই ছোট ছোট গণিতবিদরাই ভবিষ্যতে দেশের বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী বা গবেষক হয়ে গড়ে উঠবে।

বিকেল নাগাদ উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে থাকা সেই আনন্দের রেশ যেন কাটছিলই না। পুরো অনুষ্ঠানটি পীরগঞ্জ এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরা আশা প্রকাশ করেন যে, আল-হাসানা স্কুল এভাবেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলার অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে। এই শিখন ও গণিত উৎসব কেবল একটি প্রতিযোগিতা ছিল না, এটি ছিল মেধার এক বিশাল জয়জয়কার।

সম্পর্কিত নিবন্ধ