মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাটি ভৌগোলিকভাবে ভারতের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে অবস্থিত। এ কারণে এই এলাকা দিয়ে প্রায়ই মাদক এবং বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারের চেষ্টা করে চোরাকারবারিরা। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের এই অপতৎপরতা ঠেকাতে দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) সীমান্তে পৃথক দুটি বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ এবং আধুনিক মোবাইল ফোন সেট জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। এই অভিযানে শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চোরাকারবারিদের আস্তানা ও চলাচলের পথে হানা দেয় বিজিবির বিশেষ টহল দল। বিজিবির এই সক্রিয় ভূমিকায় সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিজিবি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত শুক্রবার অর্থাৎ ১৭ জুলাই সকাল তখন ঠিক সাড়ে ৯টা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৫৩ বিজিবির অধীনস্থ মনাকষা বিওপির একটি বিশেষ চৌকস দল শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাপাড়া ইউনিয়নে অভিযানে নামে। শাহাপাড়া গ্রামে যখন বিজিবির সদস্যরা পৌঁছান, তখন চোরাকারবারিরা মালামাল ফেলে পালানোর চেষ্টা করে। বিজিবি সদস্যরা এলাকাটি ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকে ২৪ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। একই সাথে বিজিবি জওয়ানরা ২০টি দামী ভারতীয় মোবাইল ফোন সেট জব্দ করেন। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে এই পণ্যগুলো কর ফাঁকি দিয়ে দেশে ঢোকানো হচ্ছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে বিজিবি।
এর ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার সকালেও বড় ধরনের সাফল্য পায় মনাকষা বিওপির একই টহল দল। সকাল ৯টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার দূর্লভপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে দ্বিতীয় অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানে বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সীমান্ত এলাকায় ওত পেতে থাকেন। এক পর্যায়ে চোরাকারবারিদের গতিবিধি লক্ষ্য করে তারা ধাওয়া দেন। সেখান থেকে ৯৮ বোতল ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা ঘন ঝোপঝাড়ের সুযোগ নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ফলে এই অভিযানে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা সম্ভব না হলেও এস্কাফ সিরাপের বড় এই চালানটি ধরতে পারা সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজিবি সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, এই দুই পৃথক অভিযানে জব্দ করা মাদক এবং মোবাইল ফোনের বাজারমূল্য অনেক বেশি। হিসেব অনুযায়ী, দুই দিনে উদ্ধার হওয়া ১২২ বোতল এস্কাফ সিরাপ এবং ২০টি মোবাইল ফোনের আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টাকা। জব্দ করার পর সব মাদকদ্রব্য সরকারি নিয়ম মেনে শিবগঞ্জ থানায় জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জব্দকৃত দামী মোবাইল ফোনগুলো পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও নিলাম প্রক্রিয়ার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুল্ক বা কাস্টমস কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত এই নজরদারির ফলে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু এই দুই দিনই নয়, চলতি জুলাই মাস জুড়ে ৫৩ বিজিবি সীমান্তে ব্যাপক তৎপরতা দেখিয়েছে। বিজিবির দেওয়া মাসিক পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই মাসে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সফল অভিযানে একজন আসামিসহ মোট ২৬৯ বোতল নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি চোরাচালান বিরোধী অভিযানে ৬৪ বোতল নেশাজাতীয় ফেয়ারডিল সিরাপ এবং ৪৬ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভারতীয় মদ উদ্ধার করেছেন বিজিবি জওয়ানরা। এছাড়া পুরো মাস জুড়ে চালানো বিভিন্ন অভিযানে মোট ২১টি অবৈধ মোবাইল ফোন সেট আটক করা হয়েছে। ৫৩ বিজিবির হিসেব মতে, চলতি মাসে এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া সব মালামালের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা। এই বিপুল পরিমাণ মাদক যদি বাজারে ছড়িয়ে পড়ত, তবে স্থানীয় যুবসমাজ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নৈতিক অবক্ষয়ের সম্মুখীন হতো।
বর্তমানে এস্কাফ বা ফেয়ারডিল সিরাপ মাদকাসক্তদের কাছে ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে ভয়ংকর নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সিরাপগুলোতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও উচ্চমাত্রার কোডেইন থাকায় তা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভারত থেকে আসা এই তরল মাদকগুলো মূলত দুর্গম সীমান্ত পথ দিয়ে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে। শিবগঞ্জ ও এর আশপাশের সীমান্ত এলাকাগুলো চোরাকারবারিরা রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে। তবে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি এবং ১০০% টহল নিশ্চিত করার কারণে এখন অনেক বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই মাদকের পেছনে যারা মূল হোতা বা বড় ডিলার, তাদেরও যেন খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়।
এই সফল অভিযানগুলোর বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের অবৈধ চোরাচালান বন্ধ করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও চোরাচালান রুখতে ৫৩ বিজিবি সবসময় সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বিজিবি সেই নীতি বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং মাদক পাচার রুখতে তারা কোনো ধরনের আপস করবে না।
পরিশেষে বলা যায়, ৫৩ বিজিবির এই ধারাবাহিক সাফল্য শিবগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে, কখনও ব্যাগে করে আবার কখনও বিভিন্ন যানবাহনের আড়ালে তারা মাদক পাচার করছে। বিজিবির চৌকস দলগুলো সেই সব কৌশল নস্যাৎ করে দিয়ে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিজিবির এই সাহসী ভূমিকায় অত্যন্ত খুশি। তবে মাদকের এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে বিজিবির পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে। ৪ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য জব্দ হওয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সীমান্তে প্রহরীরা জেগে আছে বলেই দেশের মানুষ নিরাপদে ঘুমাতে পারছে।
















