রওশন বাবু ,লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি:
লালমনিরহাট রেলওয়ে ডিভিশন এখন এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। গত কয়েক বছর ধরে এই দপ্তরে নুরুজ্জামান সরকার সোহেল এবং তার চাচা সাইদুর ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। রেলের সাধারণ কর্মচারীদের ওপর জুলুম, বদলি বাণিজ্য আর কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এখন মানুষের মুখে মুখে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও রহস্যজনকভাবে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন। এক ঝাঁক সাহসী সাংবাদিকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এবার বেরিয়ে এসেছে এই মাফিয়া চক্রের লুটপাটের ভয়ংকর সব তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নুরুজ্জামান সরকার সোহেলের বাবা আজিজুর রহমান ওরফে ‘ভুয়া আজিজ’ ছিলেন কাউনিয়ার সাবেক ফয়েজম্যান। অভিযোগ আছে, আজিজুরের কাছে লালমনিরহাট রেলওয়ে দপ্তরের প্রায় সব অফিসারের নকল সিল ছিল। এই জালিয়াতির মাধ্যমেই তারা রেলের সম্পদকে নিজেদের পকেট ভরার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। বর্তমানে সোহেল লালমনিরহাট সদর দপ্তরের ট্রাফিক বিভাগে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। এই সামান্য পদের আড়ালেই তিনি এখন ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। অন্যদিকে তার চাচা সাইদুর ইসলামও ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রংপুর বিভাগ জুড়ে এই চাচা-ভাতিজার নামে-বেনামে অসংখ্য জমি ও আলিশান বাড়ি রয়েছে।
এই সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক ভোলবদলও চোখে পড়ার মতো। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সোহেল প্রভাবশালী নেতা ও বড় বড় ঠিকাদারদের ছত্রছায়ায় ছিলেন। এমনকি তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন বলেও অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। তবে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাতারাতি সুর পাল্টে ফেলেন সোহেল। চাচা সাইদুরের হাত ধরে তিনি এখন বিএনপি ঘরানার ঠিকাদার ও নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। সাইদুর নিজে রেলওয়ে শ্রমিক দলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় এই দাপট আরও বেড়েছে। বর্তমানে তাদের একটি নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে, যারা রেলের সাধারণ কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তটস্থ রাখে।
সোহেল ও সাইদুর সরকারি নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কাই করেন না। তারা অফিসে আসেন নিজেদের ইচ্ছেমতো, আবার চলেও যান যখন মন চায়। তাদের দাপট এতোটাই যে, পুরো পরিবারকে তারা রেলওয়ের বিভিন্ন পদে বসিয়ে দিয়েছেন। সোহেলের তিন চাচা, তিন চাচি, চাচাতো ভাই এবং বোন আরজিনাসহ পরিবারের অন্তত ৮ থেকে ১০ জন সদস্য রেলওয়েতে চাকরি করছেন। বিশেষ করে সোহেলের বোন আরজিনার চাকরিতে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। তার কর্মস্থল রমনা বাজার স্টেশনের বুকিং অফিস হলেও তাকে সেখানে কখনো দেখা যায় না। অনুসন্ধানে তাকে লালমনিরহাট ডিটিএস অফিসে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ডিটিএস অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
রেলওয়ের সাধারণ কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, বদলি বাণিজ্য ও টেন্ডার সংক্রান্ত সবকিছুই এখন এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। যারা তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাদের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর নজিরও আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী জানান, শাকিল ও শারমিন নামে দুই নারী কর্মীকে ফরেজমেন্ট থেকে অফিস সহকারী পদে উন্নীত করতে সোহেলকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে খুশি করতে হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কাছে রেলের সাধারণ মানুষ আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২০ সালে রংপুর অঞ্চলের দুদকের তৎকালীন পরিচালক আব্দুল করিমের কাছে সোহেল ও সাইদুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছিল। কিন্তু অভিযোগ আছে, সেই সময় মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তদন্তের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এর ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বর্তমানে এই মাফিয়া চক্রের হাত থেকে সরকারি সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ কর্মচারীরা এখন এই দুই দুর্নীতিবাজের অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেল শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা মনে করেন, এই মাফিয়াদের আইনের আওতায় না আনলে রেলওয়ের শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। সোহেল ও সাইদুরের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে কীভাবে এই সিন্ডিকেট রেলওয়েকে ধ্বংস করছে? সাধারণ মানুষের দাবি, অতি দ্রুত এই কালো হাত গুঁড়িয়ে দিয়ে রেলওয়েকে দুর্নীতিমুক্ত করা হোক।
















