ঝিনাইদহের হরিনাকুণ্ডু উপজেলায় এক অনন্য ও আবেগঘন পরিবেশে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে রাজপথে বুক পেতে দেওয়া অকুতোভয় শহীদদের স্মরণে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার ঝিনাইদহ জেলার একমাত্র গেজেটভুক্ত জুলাই শহীদ রাকিবুল হোসেনের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়। শহীদ রাকিবুলের আত্মত্যাগের স্মৃতি মনে করে এদিন পুরো হরিনাকুণ্ডু এলাকায় এক শোকাতুর কিন্তু গর্বিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঝিনাইদহ জেলা ও হরিনাকুণ্ডু উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ রাকিবুল হোসেনের সমাধিস্তূপে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন এবং জেলা পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিশ বিন হাসান নিজে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। তাদের সাথে ছিলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট এম এ আব্দুল মজিদ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন। এ সময় শহীদ রাকিবুলের বৃদ্ধ বাবা-মা এবং গ্রামবাসী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মা-বাবার চোখের পানি আর উপস্থিত সবার নিরবতা এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করে। শহীদ রাকিবুলের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়, যেখানে শত শত মানুষ হাত তুলে আল্লাহর দরবারে শহীদদের জান্নাত কামনা করেন।
সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ্ত রায় দীপনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিবরা জুলাই আন্দোলনের গুরুত্ব এবং শহীদদের অবদান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। বক্তারা বলেন, জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার যে বিপ্লব ঘটেছিল, তা ছিল মূলত দেশের ১০০% মানুষের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের লড়াই। এই আন্দোলনে শহীদ রাকিবুল হোসেনের মতো তরুণরা তাদের মূল্যবান জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, এ দেশের মানুষ কোনো অন্যায় বা জুলুম মেনে নেয় না। বক্তারা উল্লেখ করেন, শহীদদের এই রক্তের ঋন কোনোদিনও শোধ করা সম্ভব নয়, তবে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পারলেই তাদের আত্মা শান্তি পাবে।
সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর হরিণাকুণ্ডু শাখার আমির মো. বাবুল হোসেন এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাইজাল হোসেনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বক্তারা তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সাধারণ মানুষ স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। তারা দাবি করেন, এই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তরুণ প্রজন্ম যেন শহীদদের এই আদর্শ ধারণ করে সামনে এগিয়ে যায়, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়া হয়। রাকিবুলের বাবা অত্যন্ত আবেগের সাথে জানান, তার সন্তান দেশের জন্য জীবন দিয়েছে, এতে তিনি গর্বিত। তিনি প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং চান যেন রাকিবুলের এই স্মৃতি চিরকাল সংরক্ষিত থাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, শহীদ পরিবারের যেকোনো প্রয়োজনে তারা ১০০% পাশে থাকবেন। এছাড়া জুলাই শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ ফলক স্থাপনের বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা করা হয়। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, শহীদ রাকিবুল কেবল একটি পরিবারের সন্তান নন, তিনি এখন সারা হরিনাকুণ্ডু তথা সারা বাংলাদেশের সম্পদ।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় ৩০০ এর বেশি শিক্ষার্থী এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে কেবল দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং নিজেদের চরিত্রে সেই সাহস ও ন্যায়পরায়ণতা ফুটিয়ে তুলতে হবে। বর্তমানে দেশের শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যে সংস্কার প্রয়োজন, তাতে তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। শহীদদের স্বপ্ন ছিল এমন এক বাংলাদেশ যেখানে ৫% দুর্নীতিও থাকবে না এবং মানুষের ভোটাধিকার থাকবে সুরক্ষিত। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করার শপথ নেওয়া হয় এই সভা থেকে।
উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ জাদী মাহবুবা মঞ্জুর মৌনা এবং অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তারাও এই আয়োজনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পুরো আয়োজনটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই শহীদ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের নতুন করে জেগে ওঠার দিন। জুলাই আন্দোলনে সারা দেশে যে পরিমাণ সম্পদ ও প্রাণের ক্ষতি হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও বের করা হচ্ছে, তবে মানুষের ত্যাগকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শহীদদের মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসন সর্বদা সতর্ক থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে, হরিনাকুণ্ডুর এই আয়োজনটি স্থানীয় জনমনে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। শহীদ রাকিবুলের সমাধিটি এখন স্থানীয় মানুষের কাছে এক পবিত্র স্থানে পরিণত হয়েছে। উপস্থিত সাধারণ মানুষ মনে করেন, এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে শহীদদের পরিবারের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে। জুলাইয়ের শহীদরা যে সাম্য ও মানবিক মর্যাদার কথা বলে গেছেন, তা বাস্তবায়ন করাই হবে আজকের দিনের প্রধান অঙ্গীকার। সন্ধ্যা নামার আগেই মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়, তবে শহীদদের স্মৃতি হরিনাকুণ্ডুবাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে।
















