বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৬ জুলাই একটি অবিস্মরণীয়, আবেগঘন ও রক্তস্নাত দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হয়েছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় ছাত্র আবু সাঈদ। তার সেই দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য পুরো বাংলাদেশকে এক লহমায় জাগিয়ে তুলেছিল। আজ ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই, সেই ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক ঘটনার দ্বিতীয় বার্ষিকী। দিনটিকে ‘শহীদ আবু সাঈদ দিবস’ হিসেবে স্মরণ করছে পুরো জাতি। এর ব্যতিক্রম হয়নি ঝিনাইদহ জেলার শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী উপজেলা শৈলকুপাতেও। আজ শৈলকুপায় শহীদ আবু সাঈদের স্মরণে যে স্বতঃস্ফূর্ত র্যালি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে, তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠার এক নীরব ও শক্তিশালী প্রতিবাদের প্রতীক। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে শৈলকুপার এই আয়োজন আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে।
আবু সাঈদের সেই অকুতোভয় দৃশ্য ও আত্মত্যাগ
আবু সাঈদের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্যটি হাতে একটি সাধারণ লাঠি, বুকে কোনো বর্ম নেই, দুই হাত প্রসারিত করে তিনি বুক পেতে দিয়েছেন বন্দুকের নলের সামনে। মৃত্যুর ভয় তাকে একবিন্দুও টলাতে পারেনি। একজন সাধারণ ঘরের সন্তান হয়েও তিনি যে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য এক চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তার সেই আত্মত্যাগ শুধু একটি আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং ঘুমিয়ে থাকা জাতির বিবেককে প্রচণ্ড জোরে নাড়া দিয়েছিল। আবু সাঈদ নিজের জীবন দিয়ে আমাদের শিখিয়ে গেছেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে মাথা উঁচু করে কীভাবে দাঁড়াতে হয়। তার সেই আত্মত্যাগের ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না।
শৈলকুপায় র্যালিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল
আজ ১৬ জুলাই সকালে শৈলকুপার রাস্তায় যে র্যালি বের হয়েছিল, সেখানে কোনো দলের বা গোষ্ঠীর ভেদাভেদ ছিল না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই র্যালিতে পা মিলিয়েছেন। সবার হাতে ছিল আবু সাঈদের ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড আর মুখে ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্লোগান। শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় রাস্তার দুই পাশের সাধারণ মানুষও থমকে দাঁড়িয়েছেন, শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শৈলকুপার মতো একটি মফস্বল এলাকায় মানুষের এই যে স্বতঃস্ফূর্ত ঢল, তা প্রমাণ করে আবু সাঈদ আজ শুধু রংপুরের সন্তান নন, তিনি পুরো বাংলাদেশের, প্রতিটি পরিবারের সন্তান হয়ে উঠেছেন।
দোয়ার আয়োজন ও চোখের জলে রুহের মাগফিরাত কামনা
র্যালি শেষে শৈলকুপার বিভিন্ন মসজিদে এবং খোলা মাঠে শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। দোয়ার সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেক বয়স্ক মানুষের চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে দেখা গেছে। যে বাবা-মায়েরা আবু সাঈদকে কখনো সরাসরি দেখেননি, তারাও আজ ছেলের শোকে কাঁদছেন। এই চোখের জল কোনো মেকি আবেগ নয়, এটি হলো একজন নির্দোষ ও সাহসী তরুণের প্রতি সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা। সবাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন, আবু সাঈদ যেন জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করেন এবং তার পরিবার যেন এই শোক সইবার ধৈর্য পায়।
তরুণ প্রজন্মের মনে সাহসের নতুন বীজ
শৈলকুপায় আজকের এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি। আজকের কিশোর ও তরুণেরা যখন এই র্যালি ও দোয়ায় অংশ নিচ্ছে, তখন তাদের অবচেতন মনেই সাহসের একটি নতুন বীজ বোনা হয়ে যাচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে যে, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে প্রতিবাদ করাটাই প্রকৃত বীরত্ব। আবু সাঈদ তাদের কাছে কোনো রূপকথার গল্প নন, তিনি হলেন বাস্তব জীবনের এক সত্যিকারের হিরো। শৈলকুপার তরুণ সমাজ আজ আবু সাঈদকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা শিখছে কীভাবে ভয়কে জয় করে অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে হয়। এই মানসিকতা একটি সুন্দর ও প্রতিবাদী সমাজ গঠনে দারুণভাবে সাহায্য করবে।
বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শপথ গ্রহণ
আবু সাঈদ নিজের জীবন দিয়েছিলেন কেন? তার একমাত্র চাওয়া ছিল একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও সুন্দর বাংলাদেশ। আজ শৈলকুপায় অনুষ্ঠিত র্যালি ও সমাবেশ থেকে সেই বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার শপথই নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে। আমরা যদি সত্যিই আবু সাঈদের প্রতি সম্মান জানাতে চাই, তবে আমাদের সমাজ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও বৈষম্য দূর করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শৈলকুপার সাধারণ মানুষ আজ উপলব্ধি করছে যে, আবু সাঈদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু নেতাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে।
মফস্বলে জাতীয় চেতনার এক অনন্য প্রতিফলন
সাধারণত আমরা দেখি বড় কোনো জাতীয় দিবস বা আন্দোলন শুধু ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। কিন্তু আবু সাঈদের আত্মত্যাগ সেই দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। শৈলকুপার মতো একটি উপজেলা পর্যায়ে আজকের এই স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন প্রমাণ করে যে, জাতীয় চেতনার ঢেউ এখন আর শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই, তা দেশের একেবারে তৃণমূল পর্যায়েও গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষও এখন দেশের ভালো-মন্দের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই যে তৃণমূলের মানুষের জাগরণ, এটি যেকোনো অপশক্তির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শৈলকুপাবাসীর এই আয়োজন সেই জাতীয় চেতনারই এক অনন্য প্রতিফলন।
শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব
আবু সাঈদসহ যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্মৃতিকে আমাদের সযত্নে ধরে রাখতে হবে। শৈলকুপার আজকের এই আয়োজন সেই স্মৃতি সংরক্ষণেরই একটি অংশ। তবে আমি মনে করি, শুধু একটি দিন র্যালি বা দোয়া করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আমাদের উচিত শৈলকুপার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পাঠাগার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শহীদ আবু সাঈদের নামে নামকরণ করা। এতে করে আগামী প্রজন্ম যখন ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটবে বা ওই পাঠাগারে পড়তে যাবে, তখন তারা আবু সাঈদের বীরত্বের ইতিহাস জানতে পারবে। ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের সাধারণ নাগরিকদেরও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
উপসংহার
পরিশেষে বলতে চাই, ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদ দিবস উপলক্ষে শৈলকুপায় অনুষ্ঠিত দোয়া ও র্যালি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বীরেরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকেন। আবু সাঈদের রক্তে ভেজা মাটি আজ আমাদের জন্য এক পবিত্র আমানত। তার আত্মত্যাগ আমাদের একটি স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। শৈলকুপার মানুষের এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কখনো আবু সাঈদকে ভুলবে না। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আবু সাঈদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা তার স্বপ্নের বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। আসুন, আবু সাঈদের সাহসে বলীয়ান হয়ে আমরা সবাই একটি সুন্দর আগামীর জন্য একসাথে কাজ করি।
















