ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার গাড়াগঞ্জ এখন এক উত্তাল জনপদে পরিণত হয়েছে। এলাকার হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন একটি মাত্র দাবি নিয়ে গাড়াগঞ্জকে নতুন উপজেলা ও পৌরসভা ঘোষণা করতে হবে। ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের ধারে আয়োজিত এক বিশাল গণমানববন্ধনে অংশ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। শৈলকুপার ১, ২, ৩, ১৩, ১৪ এবং ১৫ নম্বর ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষ এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন। তাদের মতে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই মানববন্ধনের আয়োজন করেন স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তবে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; বরং এটি রূপ নিয়েছিল এক বিশাল নাগরিক সমাবেশে। এতে স্থানীয় শিক্ষক, সাধারণ কৃষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী এবং স্কুল-কলেজের শত শত শিক্ষার্থী অংশ নেন। সবার হাতে ছিল দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড আর মুখে ছিল অধিকার আদায়ের স্লোগান। উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান তুর্কির নেতৃত্বে এই সমাবেশে বক্তারা পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, প্রস্তাবিত ৬টি ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার। এখানে প্রায় ২ লাখ মানুষের বসবাস এবং ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হওয়ার জন্য যে ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, গাড়াগঞ্জের তার ১০০% রয়েছে।
গাড়াগঞ্জকে কেন উপজেলা করা প্রয়োজন, তার সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বক্তারা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। বর্তমানে শৈলকুপা উপজেলা সদরের দূরত্ব এই এলাকা থেকে অনেক বেশি। ভূমি অফিস, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা অন্যান্য সরকারি দপ্তরে সামান্য কাজের জন্য মানুষকে পুরো দিন ব্যয় করতে হয়। যাতায়াত খরচ ও সময়ের অপচয় হয় প্রচুর। বিশেষ করে জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় এই দূরত্ব অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় কৃষকরা জানান, কৃষি কার্ড বা সরকারি বীজ-সার পাওয়ার জন্য তাদের দিনের পর দিন সদরে দৌড়াতে হয়, যাতে করে তাদের কাজের সময় নষ্ট হয়। তারা দাবি করেন, গাড়াগঞ্জ উপজেলা হলে এই সব সেবা তাদের ঘরের দুয়ারে চলে আসবে।
অর্থনৈতিকভাবেও গাড়াগঞ্জ এলাকাটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন হয়। কিন্তু সঠিক অবকাঠামোর অভাবে এই অঞ্চলটি তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না। বক্তারা বলেন, গাড়াগঞ্জকে পৌরসভা ঘোষণা করলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হবে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ২৫% থেকে ৩০% কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। নতুন নতুন ব্যাংক, বীমা ও করপোরেট অফিস এখানে শাখা খুলতে আগ্রহী হবে, যা সামগ্রিকভাবে ঝিনাইদহ জেলার জিডিপিতে বড় অবদান রাখবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও এই দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। বিএনপি নেতা কেরামত আলী ও নাসির উদ্দিন পাঞ্জু বলেন, “আমরা জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা বলছি। গাড়াগঞ্জ একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একে উপজেলা বানানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।” তারা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি দ্রুত এই দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে তারা আরও বড় আন্দোলনের ডাক দেবেন। রাজপথ অবরোধ বা হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ইঙ্গিতও দেন তারা। উপস্থিত সাধারণ মানুষ হাত তুলে তাদের এই দাবির প্রতি সমর্থন জানান।
শিক্ষার প্রসারেও নতুন উপজেলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বক্তারা উল্লেখ করেন, উপজেলা সদরে উন্নত মানের সরকারি কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর কষ্ট করে দূরে যেতে হবে না। বর্তমানে এই অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী সঠিক নির্দেশনার অভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রশাসনিক ইউনিট হলে এখানে সরকারি তদারকি বাড়বে এবং শিক্ষার মান অন্তত ২০% উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ হলে এই ২ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মান আমূল বদলে যাবে।
গাড়াগঞ্জকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের রেশ এখন গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই দাবির স্বপক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চলছে। সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, একটি এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। গাড়াগঞ্জ ভৌগোলিক দিক থেকে এমন এক অবস্থানে আছে যেখান থেকে আশেপাশের ইউনিয়নগুলোর সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত চমৎকার। তাই একে কেন্দ্র করে উপজেলা গঠন করা হলে তা হবে প্রশাসনের জন্য একটি লাভজনক ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত।
মানববন্ধন শেষে আয়োজকরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা জানান, খুব শীঘ্রই এই দাবি নিয়ে তারা বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করবেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার এই যৌক্তিক দাবিটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে এবং গাড়াগঞ্জবাসীকে একটি নতুন প্রশাসনিক পরিচয় উপহার দেবে। এই স্বপ্ন পূরণ হলে ঝিনাইদহের মানচিত্রে গাড়াগঞ্জ হবে উন্নয়নের এক নতুন বাতিঘর।
















