শৈলকুপায় শহীদ স্মরণ সভায় ‘ফ্যাসিস্ট’ দোসরদের উপস্থিতি: ক্ষোভে জুলাই যোদ্ধাদের সভা বর্জন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এক আলোচনা সভা ঘিরে চরম উত্তেজনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপজেলা প্রশাসন এই সভার আয়োজন করলেও সেখানে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত নেতাদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলনের অকুতোভয় যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা এই ঘটনাকে শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি হিসেবে উল্লেখ করে অনুষ্ঠান বর্জন করেন। এই ঘটনাটি বর্তমানে পুরো জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালনের অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানের শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও হঠাৎ দেখা যায়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সামনের সারিতে বসে আছেন। এদের মধ্যে ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাব্দার হোসেন মোল্লা এবং নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলামের উপস্থিতি জুলাই যোদ্ধাদের চোখে পড়ে। এই দুই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্রদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের রাজকীয় উপস্থিতি দেখে উপস্থিত ছাত্র-জনতা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানান এবং অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার ঘোষণা দেন।

প্রতিবাদকারী জুলাই যোদ্ধা রিহান হোসেন অত্যন্ত আবেগের সাথে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, তখন এই ফ্যাসিস্টরাই তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তিনি বলেন, “১০০ শতাংশ নিশ্চিত হয়েই বলছি, যারা খুনিদের মদদ দিয়েছে, তাদের সাথে একই ছাদের নিচে আমরা বসতে পারি না। এটি কেবল আমাদের জন্য অপমান নয়, বরং যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মার প্রতি চরম অবমাননা। আমরা এই পবিত্র অনুষ্ঠানে কোনোভাবেই ফ্যাসিস্টদের মুখ দেখতে চাই না।” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত অন্যান্য জুলাই যোদ্ধারাও সমর্থন জানান এবং স্লোগান দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও সংহতি প্রকাশ করেন। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবর ফিরোজ ও সিনিয়র সহ-সভাপতি খলিলুর রহমান জানান, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে যারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করেছে, তারা আজও প্রশাসনের আয়োজনে কীভাবে জায়গা পায়, তা রহস্যজনক। স্থানীয় বিএনপির নেতারা দাবি করেন, প্রশাসনের ভেতরে এখনও ফ্যাসিস্টদের প্রেতাত্মারা লুকিয়ে আছে যারা এই বিপ্লবকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। অনুষ্ঠানে রাহাত হোসেন, রাশেদ আহমেদ নবাব ও লিমন হোসেনের মতো গেজেটভুক্ত যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন, যারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে খুনিদের সহযোগীদের উপস্থিতিতে কোনো অনুষ্ঠান সফল হতে পারে না।

উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুর রহমান আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ওই বিতর্কিত চেয়ারম্যানদের প্রশাসন থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তারা মূলত ০% আমন্ত্রণেও নিজ উদ্যোগে অনুষ্ঠানে চলে এসেছিলেন। ইউএনও বলেন, “আমি বিষয়টি বুঝতে পারার সাথে সাথেই তাদের অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছি। মূলত বিশৃঙ্খলা এড়াতেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি।” তবে ছাত্ররা সভা বর্জন করেছেন—এমন দাবিকে তিনি সরাসরি স্বীকার করতে চাননি। তার মতে, পরিস্থিতির কারণে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনাটি প্রশাসনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা বা অবহেলার একটি বড় প্রমাণ। জুলাই বিপ্লবের পর যেখানে সাধারণ মানুষ ফ্যাসিবাদের সম্পূর্ণ নির্মূল চায়, সেখানে সরকারি অনুষ্ঠানে তাদের সরব উপস্থিতি মানুষকে হতাশ করেছে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, অনুষ্ঠানের প্রায় ৩০% সময় পার হওয়ার পর যখন উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, তখনই কেবল আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যানরা এলাকা ত্যাগ করেন। এর আগে পর্যন্ত তারা নির্বিকারভাবে বসে ছিলেন, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শহীদ পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা কোনো অনুকম্পা চান না, শুধু চান শহীদদের মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।

শৈলকুপার এই ঘটনাটি কেবল একটি স্থানীয় বিতর্ক নয়, বরং এটি সারা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি প্রতিচ্ছবি। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা দোসরদের চিহ্নিত করা না গেলে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বারবার ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করে, ৫ই আগস্টের পর দেশের প্রতিটি কোণ থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রভাব পুরোপুরি মুছে ফেলা জরুরি। শহীদদের রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীনতায় ঘাতকদের কোনো স্থান থাকতে পারে না—শৈলকুপার এই প্রতিবাদটি মূলত সেই বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে সবার কাছে।

এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নেটিজেনরা বলছেন, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আহত হয়ে এখনও হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন এবং শত শত পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে, সেখানে খুনিদের দোসরদের সাথে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। শৈলকুপার ছাত্র-জনতার এই সাহসী অবস্থানকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। সামনের দিনগুলোতে প্রশাসনের যেকোনো আয়োজনে যেন দেশপ্রেমিক এবং জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত অংশীদারদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, এমনটাই দাবি এখন সবার মুখে মুখে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ