ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় মাদকবিরোধী এক বিশেষ অভিযানে ৩০ পিস ইয়াবাসহ এক যুবককে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় উপজেলার বাবুগঞ্জ বাজারের একটি আসবাবপত্রের দোকানের সামনে থেকে তাকে আটক করা হয়। আটককৃত যুবকের নাম মোঃ ছোটন আলী (২৬)। তিনি শৈলকুপা থানার দোহরো মধ্যপাড়া গ্রামের মোঃ নায়েব আলীর ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা এই অভিযান পরিচালনা করে এবং ছোটনকে হাতেনাতে ধরতে সক্ষম হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাবুগঞ্জ বাজারের জনৈক মুক্তার হোসেনের ফার্নিচার দোকানের সামনে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিলেন ছোটন। পুলিশ দল সেখানে পৌঁছালে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। তবে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ফেলেন এবং তল্লাশি শুরু করেন। তল্লাশির এক পর্যায়ে তার পকেটে থাকা একটি নীল রঙের ছোট পলিথিন ব্যাগ থেকে ৩০ পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এই মাদকের বাজারমূল্য প্রায় ৯,০০০ টাকা বলে ধারণা করছে পুলিশ। শৈলকুপা থানা পুলিশ গত এক মাসে এই এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের হার প্রায় ২৫% বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অভিযানটি ছিল সেই পরিকল্পনারই অংশ।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাবুগঞ্জ বাজার এলাকাটি সন্ধ্যার পর বেশ জনবহুল থাকে। সেখানে প্রকাশ্যে এমনভাবে মাদকসহ কেউ ধরা পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গত কয়েক মাস ধরে এলাকায় অপরিচিত মুখদের আনাগোনা বেড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ছোটন আলী দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় খুচরা পর্যায়ে মাদক বিক্রি করে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে শৈলকুপা থানায় ইতিপূর্বেও মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল। পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী, এই এলাকায় মাদক সেবনকারীদের মধ্যে প্রায় ৮০% যুবক, যা স্থানীয় অভিভাবকদের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, মাদক দমনে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় থাকবে। তিনি বলেন, “আমরা সমাজকে মাদক মুক্ত করতে দিনরাত কাজ করছি। ছোটনের মতো যারা যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” পুলিশ আরও জানায় যে, আটককৃত আসামির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আজ সকালে তাকে ঝিনাইদহ জেলা আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এই সাফল্যে এলাকার সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং তারা চান যেন ১০০% মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এমন অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকে।
মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বলেন, এই এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলার প্রায় ১২% অপরাধ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে জড়িত। ছোটন আলীর মতো ছোট ছোট ডিলারদের মাধ্যমেই এই বিষাক্ত ইয়াবা সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। পুলিশ আরও তদন্ত করছে যে, ছোটন এই ইয়াবাগুলো কার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন এবং তার সাথে আর কতজন এই সিন্ডিকেটে জড়িত আছে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, গত ২ মাসে শৈলকুপায় মাদক সংক্রান্ত অভিযানের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে পুলিশ এখন প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। ছোটনের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। পুলিশ ধারণা করছে, বাবুগঞ্জ বাজার সংলগ্ন আরও কয়েকটি স্থানে মাদকের গোপন আস্তানা থাকতে পারে। এলাকার যুবকদের সঠিক পথে রাখতে পুলিশ ও এলাকাবাসীর মধ্যে এখন ৯৫% সমন্বয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। শৈলকুপার সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তারা আশা করছেন, খুব দ্রুতই এই পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
ছোটন আলীর পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গ্রামবাসী জানিয়েছে, ছোটন মাঝেমধ্যেই দোহরো গ্রাম থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাঘুরি করতেন। পুলিশ মনে করছে, ছোটন একজন পেশাদার বহনকারী বা ডিলার হিসেবে কাজ করছিলেন। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ অফিসার জানান, তারা গোপন তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ২ ঘণ্টা বাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে ওত পেতে ছিলেন। যখনই ছোটন ফার্নিচারের দোকানের সামনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই তাকে ধরা হয়। অভিযানে পুলিশের সাফল্যে থানার কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। ৩০ পিস ইয়াবাসহ ছোটনের গ্রেফতার ছোট একটি ঘটনা মনে হলেও এর মাধ্যমে বড় একটি পাচারকারী দলের তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শৈলকুপার মতো মফস্বল এলাকাগুলোতে মাদকের বিস্তার রোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। পুলিশ জানিয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অন্তত ৯০% তথ্যগত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। অপরাধী যেই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং শৈলকুপাকে একটি মাদকমুক্ত মডেল থানা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
















