ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় মাদক ও অপরাধ দমনে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। গত ১৪ ও ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই অভিযানে ২৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, মাদক বিক্রির নগদ টাকা এবং বিপুল পরিমাণ দেশীয় দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পুলিশের এমন তৎপরতায় এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ১২:৩০ মিনিটের দিকে শৈলকুপা থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হড়রা নতুন বাজার এলাকায় অভিযান চালায়। সেখানে জনৈক মোঃ রান্নু হোসেনের মুদি দোকানের সামনে থেকে মোঃ উল্লাস কাজী (৩৭) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। উল্লাস কাজী দহকোলা গ্রামের মৃত কাজী সাখাওয়াত হোসেনের ছেলে। তল্লাশিকালে তার কাছ থেকে ২৯ পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়, যার ওজন ২.৯ গ্রাম এবং আনুমানিক বাজার মূল্য ১৪,৫০০/- টাকা। এছাড়া তার কাছ থেকে মাদক বিক্রির নগদ ৩২,০০০/- টাকা এবং ৩,২০০/- টাকা মূল্যের একটি নকিয়া বাটন মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শৈলকুপা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা করে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
একই দিন সকালে শৈলকুপার ২ নং মির্জাপুর ইউনিয়নের সাধুখালিসহ বিভিন্ন গ্রামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। গ্রামগুলোতে আধিপত্য বিস্তার ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা দমনের লক্ষ্যে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে জনৈক ব্যক্তিদের বাড়ি ও বিভিন্ন গোপন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত তালিকার মধ্যে রয়েছে ৭টি ঢাল, ৩টি মাছ ধরার কোচ, ৭টি ফালা বা সরকি, ৪টি ধারালো ছোরা, ১টি দা, ১টি চাপাতি এবং ৩টি লোহার রড। পুলিশ জানায়, এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে এবং সংঘাত এড়াতে এই ধরণের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। উদ্ধার করা এই অস্ত্রগুলো দাঙ্গার কাজে ব্যবহারের জন্য মজুদ রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে শৈলকুপার উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মাহফুজুর রহমান একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ওই দিন শ্রীপুর থানার চর গোয়ালপাগা গ্রামের একদেল শেখের ছেলে মোঃ জাহাঙ্গীর শেখকে (৩৮) গাঁজা সেবনরত অবস্থায় হাতেনাতে ধরা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলেই আদালত বসিয়ে তাকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। জাহাঙ্গীরের মতো মাদকসেবীদের কারণে সমাজের যুবসমাজ নষ্ট হচ্ছে উল্লেখ করে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে বিধি মোতাবেক জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় জনশান্তি বিঘ্নিত করার অপরাধেও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৫ জুলাই শৈলকুপা সরকারি হাসপাতালের সামনের রাস্তায় উচ্চস্বরে চিৎকার করে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো এবং বিরক্তি সৃষ্টি করার অভিযোগে মোঃ লিখন শেখকে (৪২) আটক করা হয়। লিখন শেখ হড়রা গ্রামের মৃত মতবেলব শেখের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে পুলিশ আইনের ৩৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। রাস্তায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ কাউকে ছাড় দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
মাদক সেবনের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে গত দুই দিনের অভিযানে। ১৪ জুলাই দুধসর গ্রামের মৃত ফজলুর রহমানের ছেলে মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মুস্তাক (৪৬) এবং মাগুরার শ্রীপুর থানার চন্ডিখালি গ্রামের মোঃ শামিম মল্লিককে (২২) মাদক সেবনের অপরাধে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ১৫ জুলাই ছোট ধলহরাচন্দ্র গ্রামের মজনু বিশ্বাসকেও (৫০) একই অপরাধে ধরা হয়। এদের তিনজনকে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় অভিযুক্ত করে আদালতে পাঠানো হয়। বিজ্ঞ আদালত সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের প্রত্যেককে ৩ মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০০ টাকা করে জরিমানা করেছেন। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১৫ দিনের অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এলাকায় কোনো প্রকার মাদক ব্যবসা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা বরদাশত করা হবে না। বিশেষ করে গ্রামগুলোতে যেসব দেশীয় অস্ত্র মজুদ রাখা হয়, তা উদ্ধারে নিয়মিত তল্লাশি চলবে। পুলিশের এই অভিযানে সাধারণ মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও মাদক নির্মূলে আরও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। উদ্ধারকৃত ২৯ পিস ইয়াবা এবং নগদ ৩২,০০০/- টাকা উদ্ধারের ঘটনাটি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পুলিশ মনে করছে, উল্লাস কাজীর মতো মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের ফলে এলাকায় মাদকের সরবরাহ কিছুটা কমবে।
বর্তমানে শৈলকুপার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও টহল জোরদার করা হয়েছে। আটককৃত সকল আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং বিজ্ঞ আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে উপজেলাকে অপরাধমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এ ধরণের অভিযান আরও বড় পরিসরে চালানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
















