রণক্ষেত্র হরমুজ: টানা ৫ ঘণ্টা ইরানে মার্কিন হামলা, পাল্টাপাল্টি জবাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার লড়াই এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবারও ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানে টানা ৫ ঘণ্টা ধরে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন থেকে ছোড়া গোলায় কেঁপে উঠেছে ইরানের উপকূলীয় শহরগুলো। তবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে তেহরান জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের এই মুখোমুখি অবস্থানের ফলে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি এখন ১০০% অকার্যকর হওয়ার পথে। এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য এই আগুনকে আরও উসকে দিয়েছে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এখন থেকে হরমুজ প্রণালির ‘রক্ষক’ বা অভিভাবক হবে খোদ যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে যাতায়াত ফি বা কর আদায় করার পরিকল্পনাও করছে তার প্রশাসন। ট্রাম্পের এমন দাবি ইরান কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নয়। কারণ হরমুজ প্রণালিটি মূলত ইরানের উপকূল ঘেঁষে অবস্থিত এবং ইরান মনে করে এই পথে কার জাহাজ চলবে আর কার চলবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল তাদেরই রয়েছে। সমঝোতা স্মারকের ৫ম দফায় ইরানের এই কর্তৃত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখন সেই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। এই ফি আদায়ের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত এই হরমুজ প্রণালি। গত ৭ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করে। ১০ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে এই হামলা জরুরি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা বলে ট্রাম্প এখন কংগ্রেসের আলাদা অনুমতি ছাড়াই আগামী ৬০ দিন পর্যন্ত ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন। এর মানে হলো, আগামী অন্তত দুই মাস মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির কোনো আশা নেই। এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে জ্বালানি তেলের বাজারে।

হরমুজ নিয়ে এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গতকালকের হামলার পর ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ৫% থেকে ৮% পর্যন্ত বেড়ে ৮৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি গত ৪ সপ্তাহের মধ্যে তেলের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% থেকে ২৫% সরবরাহ করা হয়। যদি এই পথটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় দুঃসংবাদ, কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের স্থায়িত্ব বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে পড়বে।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ৭ জুলাইয়ের পর থেকে ৯ ও ১০ জুলাই বাদে প্রতিদিনই ইরানি ভূখণ্ডে বোমা বর্ষণ করেছে মার্কিন সেনারা। বিশেষ করে ইরানের বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। গতকালের হামলায় ইরানে একটি সাধারণ পরিবারের ৩ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। সংঘাতের এই নতুন পর্যায়ে এখন পর্যন্ত ইরানের অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক ও সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। ইরানের বুশেহর শহরের আকাশেও দিনভর মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা গেছে। সাধারণ মানুষ এখন প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। এই মানবিক বিপর্যয় সংঘাতের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) মার্কিন হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল তারা জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এছাড়া জর্ডান উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় দুটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। দুঃখজনকভাবে এই হামলায় কর্মরত একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও এখন ইরানি মিসাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের ময়দান বানিয়ে ছাড়বে। তাসনিম নিউজের খবর অনুযায়ী, ইরানি সেনারা এখন আগের চেয়ে ২০০% বেশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

১১ জুলাই এক জরুরি বার্তায় ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইরানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, “মার্কিন আগ্রাসন ও কূটচালের মুখে আমরা হরমুজ প্রণালি কখনোই খুলে দেব না।” ইরান চায় জাহাজগুলো তাদের নির্ধারিত উপকূলীয় রুট দিয়ে চলুক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ওমান উপকূলের দক্ষিণ দিক দিয়ে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে। এই রুটের দখল নিয়েই মূলত সংঘাত চরমে পৌঁছেছে। আকরামিনিয়া আরও বলেন, এই জলপথের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ইরান কোনো ধরনের ছাড় দেবে না এবং প্রয়োজনে তারা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থমকে গেছে। দুই দেশই এখন শক্তির লড়াইয়ে ব্যস্ত। যদি দ্রুত কোনো সমাধান না আসে, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে করে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশ জ্বালানি সংকটে পড়বে। তেলের দাম বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এখন পর্যন্ত নীরব দর্শক হয়ে থাকলেও, এই সংঘাতের আঁচ খুব শিগগিরই সবার ঘরে পৌঁছাবে। হরমুজ এখন কেবল একটি জলপথ নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বযুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।দ্ধ

সম্পর্কিত নিবন্ধ