শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে রণক্ষেত্র রাজপথ: পুলিশের লাঠিপেটা ও শিক্ষার্থীদের লংমার্চের ঘোষণা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারী বৃষ্টি আর তীব্র জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘ফার্মের মুরগী’ সদৃশ আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল দিনভর উত্তাল ছিল সারা দেশ। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ১৩টি জেলায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটা করে। তবে পুলিশের লাঠিপেটা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা দমে যাননি। তারা আজ বুধবারের পরীক্ষা স্থগিত না করলে বেলা ৩টায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ৩ দফা দাবির মুখে শিক্ষা ব্যবস্থায় এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।

গতকাল সকাল ১১টা থেকেই রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন কলেজের শত শত শিক্ষার্থী। এর ফলে ওই এলাকার যান চলাচল ১০০% বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশের সড়কে কয়েক মাইল দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, গত সোমবার ভয়াবহ বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকের পরীক্ষার খাতা ভিজে গেছে, আবার যাতায়াতের সমস্যার কারণে অনেকেই সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের ঘরবাড়ি পানির নিচে, রাস্তাঘাট ডুবে আছে, আর এই অবস্থায় আমাদের জোর করে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। আমরা কি মানুষ নাকি কোনো যন্ত্র?” শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি মন্তব্য, যেখানে তিনি পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগী’র সাথে তুলনা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুপুরের পর আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখানে তারা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন এবং শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের মূল ফটকে ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে তারা আবার সায়েন্স ল্যাবে ফিরে আসেন এবং বিকেলে সংসদ ভবনের দিকে রওনা দেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে কয়েক শ শিক্ষার্থী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়। লাঠিপেটা করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করলে বেশ কয়েকজন আহত হন। এই ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং রাত পৌনে ১০টার দিকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজপথ ছাড়েন।

রাজধানীর বাইরেও বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো। চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীরা মুরাদপুর এলাকায় শিক্ষা বোর্ডের সামনে বিক্ষোভ করেন। বন্যায় অনেকের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা দ্রুত নতুন কার্ড দেওয়ার দাবি জানান। অন্যদিকে, রাজশাহীতে কয়েক শ শিক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন এবং চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। বরিশাল ও টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ করে যান চলাচল স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। বরিশালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক প্রায় ৩ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়েছিল, যার ফলে কয়েক হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন। এছাড়া সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর ও বগুড়াতেও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। সব জায়গাতেই একটিই দাবি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে দুটি ভুলের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন। প্রয়োজনে যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে সেখানে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।” তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তবে শিক্ষার্থীরা মন্ত্রীর এই আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, মন্ত্রী এর আগেও অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। তাই মন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া তারা কোনো আপস করবেন না। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের পরীক্ষা দেওয়ার কোনো মানসিক অবস্থা নেই এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি আদায় না হলে তারা সচিবালয় ঘেরাও করবে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা ‘ফার্মের মুরগী’ মন্তব্যের জন্য রাতে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে বা কাউকে ছোট করার জন্য কিছু বলিনি। আমার কথায় যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে আমি সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করছি।” মন্ত্রী আরও জানান, বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মন্ত্রীর এই দুঃখ প্রকাশ আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা বলছেন, দুঃখ প্রকাশ করলেই অপমান মুছে যায় না। তারা মনে করেন, একজন শিক্ষামন্ত্রী যখন শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্রূপ করেন, তখন তিনি ওই পদের মর্যাদা হারান।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সাধারণ মানুষের জনজীবনেও এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বন্ধ থাকায় অফিসগামী মানুষ ও রোগীদের হাসপাতালে নিতে স্বজনরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। যানজটের কারণে রাজধানীর অর্থনীতির চাকা ওই দিনের জন্য প্রায় ৫০% স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবুও অনেক অভিভাবক শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছেন। ধানমন্ডি এলাকায় এক অভিভাবক বলেন, “আমার সন্তান ভিজে একাকার হয়ে পরীক্ষা দিয়ে ফিরেছে। এই দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়াটা ছিল সরকারের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত।” অভিভাবকদের এই সমর্থন শিক্ষার্থীদের মনোবল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আজ বুধবারের পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আজকের পরীক্ষা স্থগিত না হলে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করবেন। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত পরীক্ষা পেছানোর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। এই মুখোমুখি অবস্থানের ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কি শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে, নাকি শক্তি প্রয়োগ করে এই আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষ আশা করছে, দ্রুত একটি যৌক্তিক সমাধান আসবে, যাতে পরীক্ষার্থীরা কোনো ভয় বা আতঙ্ক ছাড়া পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ