সংবিধান সংশোধন নিয়ে রাজপথে নামছে বিরোধী দল: বিশেষ কমিটির পথে হাঁটছে সরকার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে সরকারি দল চাচ্ছে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে, অন্যদিকে বিরোধী দল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড়। এই টানাপোড়েনের মাঝেই সরকার তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল উত্থাপন করবে। তবে বিরোধী দল এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে এবং এখন তারা রাজপথে বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুরুতে এই কমিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বিরোধী দল তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ৫টি পদের জন্য কোনো নাম না দেওয়ায় ওই পদগুলো আপাতত শূন্য রাখা হয়েছে। সরকারি দল মনে করছে, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, একটি বিশেষ কমিটি দিয়ে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার করা সম্ভব নয়। তারা মনে করেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করতে হলে একটি স্বাধীন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ দরকার। বর্তমান এই রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের সাধারণ মানুষের মনে ১০০% দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করেছে।

কমিটি গঠনের পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। এই কমিটিতে বিএনপির ৮ জন সংসদ সদস্যের পাশাপাশি জোনায়েদ সাকি, আন্দালিব রহমান পার্থ এবং নুরুল হক নুরের মতো পরিচিত মুখদের নাম রাখা হয়েছে। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহর নাম কমিটিতে থাকলেও তিনি জানিয়েছেন যে তাকে না জানিয়েই এটি করা হয়েছে। অলিউল্লাহ বলেন, “আমি যখন সংসদে ছিলাম না, তখন আমার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আমি মনে করি ৭০% মানুষের রায়কে উপেক্ষা করে এভাবে কমিটি গঠন করা জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল।” তার এই বক্তব্য সরকারের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা কোনোভাবেই সরকারের এই বিশেষ কমিটির অংশ হবেন না। নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করতে চাচ্ছে, যা জাতিকে একটি গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।” বিরোধী দল এখন জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। তারা মনে করছে, কেবল সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করলে জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

বিরোধী দলের আন্দোলনের মূল শক্তি হলো সাম্প্রতিক গণভোটের রায়। তাদের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৭০% মানুষ সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, গণভোটের পর এই সংস্কার এখন একটি জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, তারা কেবল সংসদেই প্রতিবাদ জানাবেন না, বরং সারা দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করবেন। তাদের লক্ষ্য হলো সরকারকে বাধ্য করা যেন তারা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ মেনে নিয়ে একটি নিরপেক্ষ সংস্কার পরিষদ গঠন করে। রাজপথের এই উত্তাপ যে সামনের দিনগুলোতে বাড়বে, তা এখন ২০০% নিশ্চিত।

তবে সরকারের অবস্থান একেবারে ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আগে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী কাজ শুরু করতে হবে। যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়, তবেই সংবিধানে নতুন কোনো পরিষদের বিধান যুক্ত করা যেতে পারে। সরকারের মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও প্রথমে সংবিধান সংশোধন দরকার আর সেটির জন্য উপযুক্ত জায়গা হলো সংসদের বিশেষ কমিটি। সরকারি দলের এমপিরা মনে করছেন, বিরোধী দল কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সংসদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো সংশোধনী পাস করতে হলে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সরকার চাচ্ছে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুপারিশমালা তৈরি করতে, যা পরে বিল আকারে আসবে। কিন্তু বিরোধী জোট মনে করছে, এটি একটি ‘আইওয়াশ’ মাত্র। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও সরকারের এই উদ্যোগের সমালোচনা করে বলেছে, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে পদদলিত করে সরকার নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার ফন্দি আঁটছে। তাদের মতে, এটি জনগণের সাথে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা। দলগুলোর মধ্যে এই আস্থার সংকট এখন চরমে।

পরিশেষে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। একদিকে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে কাজ শেষ করার সরকারি জেদ, অন্যদিকে রাজপথে আন্দোলনের ডাক দেওয়া বিরোধী দল। সাধারণ মানুষ চায় একটি স্থিতিশীল পরিবেশ এবং সুন্দর সংবিধান, যেখানে তাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু প্রধান দুই পক্ষের এই মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় সমাধানটি এখন রাজপথের শক্তির ওপরই নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সামনের দিনগুলোতে সরকারের নমনীয়তা বা বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলন কোনটি জয়ী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ