শৈলকূপায় মধ্যরাতে পুলিশের ঝটিকা অভিযান: ২৯ পিস ইয়াবাসহ কুখ্যাত মাদক কারবারি উল্লাস কাজী গ্রেফতার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকূপায় মাদকবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য পেয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশ। গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে উপজেলার হরড়া নতুন বাজার এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই অভিযানে ২৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে মোঃ উল্লাস কাজী (৩৭) নামে এক ব্যক্তিকে। সে উপজেলার দহকোলা গ্রামের মৃত কাজী সাখাওয়াত হোসেনের ছেলে। গভীর রাতে মাদক কেনাবেচার সময় পুলিশ তাকে ঘেরাও করে ফেলে এবং পালানোর কোনো সুযোগ দেয়নি।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, শৈলকূপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় খবর পায় যে, হরড়া নতুন বাজার এলাকায় মাদক কারবারিদের একটি চক্র সক্রিয় হয়েছে। খবর পাওয়ামাত্রই পুলিশ সদস্যরা সিভিল পোশাকে ওই এলাকায় অবস্থান নেন। রাত যখন সাড়ে ১২টা, তখন বাজারের জনৈক মোঃ রান্নু হোসেনের মুদি দোকানের সামনে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিল উল্লাস কাজী। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে তাকে ঝাপটে ধরেন। পরে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তার দেহ তল্লাশি করে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ২৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত উল্লাস কাজী এলাকার দীর্ঘদিনের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সে দীর্ঘদিন ধরে দহকোলা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক সরবরাহ করে আসছিল। তার এই গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বিশেষ করে অভিভাবকরা অত্যন্ত আনন্দিত, কারণ তাদের মতে, এই ধরনের মাদক কারবারিদের কারণেই এলাকার যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই অঞ্চলের প্রায় ২০% তরুণ কোনো না কোনোভাবে মাদকের মরণনেশায় জড়িয়ে পড়েছে, যার বড় একটি কারণ হলো উল্লাসের মতো খুচরা বিক্রেতাদের সহজলভ্যতা।

শৈলকূপা থানা পুলিশ জানায়, বর্তমান সরকারের মাদকবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে তারা এই অভিযান চালিয়েছেন। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এই মাদকগুলো ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধ পথে আনা হয়েছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট বর্তমানে খুচরা বাজারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। ধৃত উল্লাসের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মাদকের বাজারমূল্য প্রায় ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা। পুলিশ মনে করছে, তার সাথে আরও বড় একটি সিন্ডিকেট জড়িত আছে যারা পর্দার আড়াল থেকে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।

মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে শৈলকূপাকে মুক্ত করতে পুলিশ এখন ১০০% কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে এই থানায় মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পুলিশের সক্রিয়তাকেই প্রমাণ করে। তবে শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, মাদক কেনাবেচার মূল উৎসগুলো বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। হরড়া নতুন বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গভীর রাতে বাজারের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। রান্নু হোসেনের দোকানের সামনের এই এলাকাটি মাদক আদান-প্রদানের একটি সেফ জোন হিসেবে অপরাধীরা ব্যবহার করে আসছিল।

গ্রেফতারের পর উল্লাস কাজীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। আজ সকালে তাকে ঝিনাইদহ জেলা আদালতে পাঠানো হবে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, উল্লাস কাজীর নেটওয়ার্কে আর কারা কারা আছে এবং সে কার কাছ থেকে এই ইয়াবা সংগ্রহ করেছিল, তা জানার জন্য প্রয়োজনে আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। স্থানীয়দের মতে, দহকোলা ও হরড়া এলাকায় মাদকের সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিতে হলে এ ধরনের আরও অভিযান প্রয়োজন।

এলাকার সমাজসেবীরা বলছেন, মাদকের কারণে এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। যখন একজন আসক্ত ব্যক্তি নেশার টাকা জোগাড় করতে পারে না, তখন সে ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে শৈলকূপার গ্রামগুলোতে চুরির ঘটনা ১০% থেকে ১২% বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ এই মাদক। তাই পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি। এলাকার ৮০% মানুষ যদি মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তবেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

শৈলকূপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গণমাধ্যমকে বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের এই যুদ্ধ চলবেই। আমরা কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করব না। উল্লাস কাজীকে গ্রেফতারের মাধ্যমে আমরা মাদক কারবারিদের একটি কড়া বার্তা দিতে চেয়েছি। সাধারণ মানুষ যদি আমাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে, তবে আমরা খুব দ্রুতই এই এলাকাকে মাদকমুক্ত ঘোষণা করতে পারব।” পুলিশের এই সাফল্যে সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছে। তারা চায়, কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসতে না পারে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।

পরিশেষে, মাদকবিরোধী এই অভিযানে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতা প্রশংসার দাবি রাখে। মধ্যরাতে যখন সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন পুলিশ সদস্যরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই অপরাধীদের পাকড়াও করছেন। উল্লাস কাজীর মতো সমাজবিরোধীদের বিচারের মুখোমুখি করার মাধ্যমে সমাজের ক্ষত নিরাময় করা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়ায় এই মামলার ভবিষ্যৎ কী হয় এবং এলাকার মাদক পরিস্থিতি কতটুকু নিয়ন্ত্রণে আসে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ