অতিকথন বন্ধ করে দূরদর্শিতার পরিচয় দিন: শিক্ষামন্ত্রীকে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের কড়া হুঁশিয়ারি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের শিক্ষাখাতে চলমান অস্থিরতা এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু। আজ মঙ্গলবার বিকেলে এক জরুরি বিবৃতিতে তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “অতিকথন বন্ধ করুন এবং একজন দায়িত্বশীল মানুষের মতো দূরদর্শিতার পরিচয় দিন।” তিনি মনে করেন, মন্ত্রীর কিছু বিতর্কিত মন্তব্য এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজনের একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তই আজ শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।

গত কয়েকদিন ধরেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা উত্তাল আন্দোলন গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছে। এই আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে, তীব্র দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে মন্ত্রীর করা কিছু অবমাননাকর মন্তব্য। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মন্ত্রী তাদের ‘ফার্মের মুরগী’ বলে সম্বোধন করেছেন, যা একজন অভিভাবকতুল্য মন্ত্রীর কাছ থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই মন্তব্য ১০০% অনভিপ্রেত এবং শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

বিবৃতিতে জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ১২ ও ১৩ তারিখে সারাদেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৮০% রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন করা ছিল একটি চরম অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। মন্ত্রী যদি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আগেভাগে কোনো দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতেন, তবে আজ হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে বৃষ্টিতে ভিজে রাজপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হতো না। শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ধ্বংসপ্রায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। গত ৫-১০ বছরে শিক্ষা খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান মন্ত্রী অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন ঠিকই, কিন্তু তার ‘অতিকথন’ বা অতিরিক্ত কথা বলার স্বভাব সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আপনি কাজ করছেন, সেটা ভালো কথা। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কথা বলে বিতর্ক সৃষ্টি করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি মূলত মন্ত্রীর অদূরদর্শী বক্তব্য ও আচরণেরই ফল।”

আজকের বিবৃতিতে জানানো হয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে যখন শত শত শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়েছিল, তখন রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা প্রধান সড়কগুলো অচল হয়ে থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ২০০% বেড়ে গিয়েছিল। অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের দাবি একটাই—শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয় এবং শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে এমন কোনো কথা মন্ত্রী যেন আর না বলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় যদি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই নিজের ভাষা ও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আরও সংযত হতে হবে। একজন মন্ত্রী যখন শিক্ষার্থীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিজেকে অপমানিত বোধ করে। এই অপমানের জের ধরেই তারা আজ শিক্ষা বোর্ড ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি পালন করছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করাই এখন একমাত্র পথ। বলপ্রয়োগ বা হুমকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমানো যাবে না।

পরিশেষে, অভিভাবক ঐক্য ফোরামের পক্ষ থেকে সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বিবেচনা করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানান দুলু। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রাজপথে ঠেলে দিয়ে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষামন্ত্রীকে তার অতিকথন বন্ধ করে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায়, অভিভাবকদের সাথে নিয়ে এই আন্দোলন আরও বেগবান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা এখন শুধু পরীক্ষার তারিখ পেছানো নয়, বরং মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। এই সংকট কাটাতে হলে সরকারকে এখনই মধ্যস্থতা করতে হবে। সাধারণ মানুষ আশা করে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকার একটি সুষ্ঠু সমাধান বের করবে, যাতে পরীক্ষার্থীরা পুনরায় পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে পারে এবং দেশের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ