প্রাথমিক শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে চারুকলা ও সংগীত: আগামী ৫ বছরে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের ঘোষণা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের জন্য দারুণ এক খবর নিয়ে এল সরকার। শুধু বইয়ের পাতায় মুখস্থ বিদ্যা নয়, এখন থেকে শিশুরা স্কুলেই গান, নাচ, ছবি আঁকা আর খেলাধুলার তালিম পাবে। এই নতুন উদ্যোগের ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত, নৃত্যকলা ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করবে সরকার। এর ফলে ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো শেখানোর জন্য প্রচুরসংখ্যক বিশেষায়িত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের দরকার পড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই খাতে অন্তত ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে সরকার।

আমাদের দেশে যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলা, নাট্যকলা কিংবা ক্রীড়া বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন, তারা অনেক সময় বেকারত্বের হতাশায় ভোগেন। একটি বেসরকারি সমীক্ষায় দেখা যায়, চারুকলা বা সংগীতে পড়াশোনা করা প্রায় ৪০% তরুণ-তরুণী তাদের বিষয়ভিত্তিক কোনো ভালো ও স্থায়ী চাকরি পান না। বাধ্য হয়ে তারা অন্য পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এসব শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন আশার আলো তৈরি হলো। তাদের জন্য একদম নতুন ও টেকসই একটি ক্যারিয়ার পাথওয়ে বা কর্মজীবনের রাস্তা গড়ে উঠবে। সরকার এই খাতে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যাতে শিক্ষকরা ভালো বেতন ও সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারেন।

আজ বুধবার রাজধানী ঢাকায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার মূল বিষয় ছিল প্রাথমিক শিক্ষায় কীভাবে সংগীত, নৃত্যকলা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার আরও প্রসার ঘটানো যায়। নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন ও দক্ষ শিক্ষক তৈরির বিষয়ে আলোচনা করতে দেশের ২৪টি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা ও চারুকলা বিভাগের প্রধান এবং বিশেষজ্ঞরা এই সভায় যোগ দেন। সভার শুরুতেই প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ উপস্থিত সবার সামনে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা খুব সহজভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের জায়গায় নিয়ে যাওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাহায্য খুব বেশি দরকার। তাই প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ উপস্থিত শিক্ষকদের কাছে আন্তরিক সহযোগিতা চান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা মন থেকে চাই আপনাদের ছাত্রছাত্রীরা যেন পড়াশোনা শেষ করে খুব সহজেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তাদের কীভাবে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, সেই পথ আমাদের একসঙ্গে বের করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষকতা পেশার প্রস্তুতি কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে মন্ত্রণালয় আপনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। দক্ষ শিক্ষক তৈরি করতে পারলে তবেই সরকারের এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক শিক্ষার ওপর অনেক জোর দেয় সরকার। ইউরোপ বা আমেরিকার অনেক দেশ তাদের মোট শিক্ষা বাজেটের প্রায় ১০% থেকে ১৫% শুধু শিল্প ও সংস্কৃতির পেছনে খরচ করে। আমাদের সরকারও এখন সেই আধুনিক পথে হাঁটতে চায়। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, আমরা গান, নাটক বা নাচকে শুধু অবসর সময়ের বিনোদন বা সাধারণ সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে দেখতে চাই না। বরং আমরা এগুলোকে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের একটি অত্যন্ত জরুরি অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব। এ জন্যই নতুন কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম তৈরি করার পাশাপাশি এখন থেকেই দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের বড় পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকার।

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী এই নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী চান আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যেন শুধু গণ্ডির ভেতর আটকে না থাকে। তারা যেন বড় হয়ে সত্যিকারের বৈশ্বিক নাগরিক বা গ্লোবাল সিটিজেন হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। বর্তমানে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের গান বা নাচ শেখাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসে ৫০থেকে১০০(ডলার) পর্যন্ত খরচ করেন। স্কুলে এই সুবিধা চালু হলে অভিভাবকদের সেই বিশাল খরচ বাঁচবে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও শিশুরা স্কুল থেকেই শিখতে শুরু করবে। আর একটি শিশুর মননশীলতা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। সংস্কৃতিচর্চা শিশুদের মনকে উদার করে এবং তাদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলে।

এই নতুন পরিকল্পনাগুলো কবে থেকে শুরু হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট সময়রেখাও সভায় জানিয়ে দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। সরকার আগামী ২০২৭ সালে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ নামের একটি নতুন পাঠ্যবই যোগ করবে। এই বইয়ের চারটি আলাদা অধ্যায়ে চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা এবং নাট্যকলা খুব সুন্দরভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এরপর ২০২৮ সাল থেকে নতুন কারিকুলামে এই বিষয়গুলো একেবারে পূর্ণাঙ্গভাবে সব শ্রেণিতে যুক্ত হয়ে যাবে। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ যদি ১০০% সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে আগামী দিনে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার চেহারা পুরোপুরি বদলে যাবে এবং একটি সৃজনশীল ও সংস্কৃতিমনা নতুন প্রজন্ম তৈরি হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ