বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ এখন এক চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বর আর গায়ে লাল র্যাশ নিয়ে দিনরাত হাসপাতালে ছুটছেন উদ্বিগ্ন বাবা-মায়েরা। এর মধ্যেই দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১ জন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার সকাল আটটা পর্যন্ত এই ১১ শিশুর মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এদের মধ্যে দুজন শিশু সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বাকি ৯ জন শিশুর শরীরে হামের সব ধরনের উপসর্গ থাকলেও, পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার আগেই তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব হঠাৎ করেই সারা দেশে বেড়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৯৯ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া এই শিশুদের মধ্যে ৪১৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ ছিল এবং ৮৫ জন শিশু হামে আক্রান্ত বলে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছিল। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অনেক শিশু সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পায় না। ফলে তাদের রোগ শনাক্ত করার আগেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যায়। শিশুদের এমন অকাল মৃত্যুতে পরিবারগুলোতে এখন শুধুই কান্নার রোল।
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। একজন আক্রান্ত শিশুর হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই অন্য শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু নতুন করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, শুধু গত একদিনেই সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ২৬১ জন শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে হিসাব করলে দেশে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভোগা শিশুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ জনে। অন্যদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৪ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে গত দুই মাসের কিছু বেশি সময়ে দেশে মোট ৮ হাজার ৩২৯ জন শিশুর হাম শনাক্ত হলো।
আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে অভিভাবকেরা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন। রোগীর এত চাপ যে অনেক হাসপাতালে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ডাক্তার এবং নার্সরা দিনরাত এক করে শিশুদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৭ হাজার ৫১১ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে এত খারাপ খবরের মাঝেও বড় একটি আশার কথা হলো, সঠিক চিকিৎসায় অনেক শিশুই সুস্থ হয়ে মায়ের কোলে ফিরে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ৪৩ হাজার ৪১১ জন শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে। শতকরা হিসাব করলে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে সুস্থতার হার প্রায় ৯১.৩%। চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই এত বিশালসংখ্যক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।
চিকিৎসার এই দীর্ঘ লড়াইয়ে অনেক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে পাওয়া গেলেও, ওষুধের সংকট বা শয্যাসংকটের কারণে অনেকেই বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। একটি শিশুকে কয়েক দিন ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে অনেক পরিবারের গড়ে প্রায় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে। যাতায়াত, বাইরের ওষুধ কেনা এবং পুষ্টিকর খাবারের খরচ মিলিয়ে এই অঙ্ক আরও বেড়ে যায়। বর্তমানের চড়া বাজারের এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এত টাকা জোগাড় করা রীতিমতো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সন্তানের জীবন বাঁচাতে অনেকেই চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন বা শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
চিকিৎসকেরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, হাম একটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক নিয়মে শিশুকে হামের টিকা দিলে এই প্রাণঘাতী রোগের হাত থেকে খুব সহজেই বাঁচানো যায়। বাংলাদেশে সরকারিভাবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক বাবা-মা অবহেলা করে বা সচেতনতার অভাবে শিশুকে সময়মতো টিকা দেন না। অনেক সময় একটি ডোজ দিয়ে পরের ডোজটি দিতে ভুলে যান। এর ফলেই মূলত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং এমন প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে দেশের দুর্গম এলাকাগুলোতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কিন্তু শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। কোনো শিশুর টানা উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং গায়ে লালচে র্যাশ বা দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ করা যাবে না। তাকে দ্রুত কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের পাশাপাশি শিশুকে অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা রাখতে হবে, যাতে রোগটি ছড়িয়ে না পড়ে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল শিশুদের এই ভয়ংকর ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
















